Showing posts with label Nirban Originals. Show all posts
Showing posts with label Nirban Originals. Show all posts

Thursday, 9 May 2019

**থর ও তার অস্ত্রের ছোট্ট ইতিহাস**

অ্যাভেঞ্জার্স ইনফিনিটি ওয়ার দেখতে গেছিলাম গ্যাংটকের ডেনজং সিনেমা হলে। ছোট্ট সুন্দর সাজানো গোছানো হল। সেসব পরে কখনো বলবো। সিনেমাটা কেমন লাগল তার বিষদে না গিয়ে একটা কথাই বলবো যে মাত্রাতিরিক্ত পপুলারিটি হয়ে গেলেই যেকোন জিনিস গেঁজে যায়। মার্ভেলের এই সিরিজ যখন শুরু হয়েছিল তখন ক্লাস নাইনে বোধহয় পড়ি। বাড়িতে কম্পিউটার থাকলেও নেট ছিল না। এক বন্ধুর বাড়ি থেকে ডাউনলোড করে এনে দেখতাম। পরে হলেও গেছি অনেকবার। কিন্তু শালা লাস্ট কিছু বছরে কম পয়সায় নেট পেয়ে প্রচুর ভুলভাল পাবলিক ঢপের চপ কিছু না বুঝেই সবেতে পোঁদ পাকামি মেরে সস্তায় ট্রেন্ড ফলো করার জন্য আর কুল হওয়ার জন্য সব জিনিসে নাক গলাচ্ছে। প্রোডিউসাররাও ভাই স্রেফ মাল্লু বোঝে। তারা মাস আপিলের জন্য আরো বেশী খরচা করে আরো কম স্টোরিলাইনওয়ালা ক্লিশে মাল নামাচ্ছে। যেমন গেম অফ থ্রোনসটার এখন দশা। ২০১৩ সাল থেকে আমি গেম অফ থ্রোনস দেখি, তখন খুব কম লোক দেখত। বইগুলোও পড়ে নিয়েছিলাম। ওই ২০১৭ নাগাদ থেকে থেকে গুচ্ছের ছেলেপুলে বন্ধুবান্ধবদের কাছে 'ক্লাস' বজার রাখার জন্য জোর করে দেখা শুরু করল আর সে মালও গেঁজে গেল। যাইহোক, আমার আজকের লেখার বিষয়টা অন্য। বেশীরভাগ পাবলিকই থরকে চেনে মার্ভেলের সুপারহিরো হিসেবে। আর আমেরিকানরা তো সব জিনিসই নিজেদের মত গড়েপিটে তৈরি করে নেয় আর গোটা দুনিয়া তা হাঁ করে গেলার জন্য বসে থাকে। থর কমিক্স বা সিনেমাগুলো নিয়ে আমার কোনো কমপ্লেইন নেই, বরং মার্ভেল সিরিজের মধ্যে আমার সবথেকে প্রিয়। তবে এই ইনফিনিটি ওয়ারে থরের অস্ত্র বানানোর ব্যাপারটা খুব যাতা লেভেলের বাজেভাবে পোর্ট্রে করা হয়েছে। তাই যারা ঈত্রি, থর, থরের অস্ত্র এসবের ইতিহাস জানেন না, মার্কিনি মুভি দেখে মিসগাইডেড হচ্ছেন তাদের জন্যই এই লেখাটা রইল। শৈশবে সুকুমার, কৈশোরে 'এজ অফ মাইথোলজি' আর দামড়া বয়সে Neil Gaiman আমার নর্স মাইথোলজির বেস তৈরি করেছেন। তাই বিশ্বাস করে দেখতে পারেন। ভুল তথ্য খুব একটা দেবো না। খুব ছোট করে লিখলাম। তাড়াহুড়োয় ভুল ত্রুটি কিছু হয়ে থাকলে মার্জনা করবেন।

নরওয়ের যুদ্ধের দেবতা ওডিনপুত্র থর ছিলেন অসীম শক্তিধর। তিনি আবার বজ্রের দেবতাও বটে। থরের শক্তি আর মেজাজের সাথে দেবতা থেকে অসুর সকলেই ভালোরকম পরিচিত ছিল। থরকে সহজে কেউ ঘাঁটাত না। রগচটা থরের একটা কোমরবন্ধ ছিল যেটা কোমরে বাঁধলে তার শক্তি বহুগুণ বেড়ে যেত। স্বর্গের সেরা সুন্দরী সিফ ছিলেন থরের স্ত্রী। তার ঝরণার জলের মত কোমর অবধি নেমে আসা সোনালি চুলের দিকে সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। তো যাই হোক, একদিন সকালে থরের ঘুম ভাঙল সিফের চেঁচামিচিতে। সব দেখে শুনে তো থরের আক্কেল গুড়ুম। সিফের মাথাজোড়া সোনালি চুল গোড়াসুদ্ধু উধাও হয়ে গেছে। কোথাও তার লেশমাত্রও নেই। ন্যাড়ামাথা সিফ তো হাউমাউ করে কেঁদেই চলেছে। এসব দেখেশুনে বেদম রেগে থর গিয়ে পাকড়াও করল লোকিকে কারণ সবাই জানে যে দুর্বুদ্ধি আর দুষ্টুমির দেবতা লোকি বিনা কারণে অপরের ক্ষতি করতে চাইলে আর কিছু চায় না। বেদম ঠ্যাঙানি খেয়ে লোকি তার শয়তানি কবুল করে বলল যে থরের স্ত্রীর জন্য সে এত সুন্দর সোনার চুল এনে দেবে যে তার তুলনা স্বর্গ মর্ত্য পাতালে হয় না। থর বলল ভাল কথা কিন্তু লোকি যদি তা নিয়ে আসতে না পারে তবে থর লোকির শরীরের সবকটা হাড় একে একে মড়মড়িয়ে ভাঙবে।
ব্যাজার মুখে লোকি চলল স্বার্তালহেইম (Svartalfheim) বা বামনলোকে, কারণ কে না জানে যে বামনরা এই মহাজগতের সবচেয়ে দক্ষ কারিগর - তারা তৈরি করতে পারে না এমন জিনিস নেই।
ইভালডির তিন ছেলে ছিল বামনলোকের শ্রেষ্ঠ তিন কারিগর। লোকি তাদের কাছে গিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বলল যে স্বর্গের দেবতারা একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন যেখানে আসগার্ডের তিন মহান দেবতার জন্য একটি করে উপহার তৈরি করতে হবে। আদি দেবতা ওডিন, বজ্রদেব থর আর সমৃদ্ধির দেবতা ফ্রে হবেন বিচারক। যার তৈরি উপহার দেবতাদের সবচেয়ে মনে ধরবে তাকে মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ কারিগর ঘোষণা করা হবে। আর হ্যাঁ, এইসব উপহারের মধ্যে অবশ্যই খাঁটি সোনার ঘন লম্বা চুল থাকতে হবে যা কিনা কারো মাথায় চাপালে একদম গোড়া থেকে আটকে যাবে, আর তার বাড়বৃদ্ধি হবে প্রাকৃতিক চুলের মত। লোকিকে কেউ বিশ্বাস করত না। ইভালডির ছেলেরা লোকিকে জিজ্ঞেস করল এতে তার কোন স্বার্থ আছে কি না। লোকি বলল, "হায় কপাল, আমার আবার কিসের স্বার্থ! দেবতারা সব বলাবলি করছিলেন যে ব্রক্ (Brokk) আর ঈত্রি (Eitri) দুই ভাই নাকি সেরা কারিগর আর বাজি তারাই জিতবে। তাই আমি ভাবলুম ব্যাপারটা তোমাদেরও জানা দরকার কারণ যতই হোক তোমরাও তো মন্দ নও।"
ইভালডির ছেলেরা ব্রক্ আর ঈত্রিকে মোটেই সহ্য করতে পারত না। তারা বেদম রেগে বলল, "ছো:! সামান্য একটা গাঁইতি তৈরি করতে যাদের হাত কাঁপে তারা আবার কিসের কারিগর? তারা নাকি আবার দেবতাদের জন্য উপহার তৈরি করবে। বাজি তো আমরাই জিতব।"
মহা খুশি হয়ে লোকি চলল দুই বামন ভাই ব্রক্ আর ঈত্রির কাছে। আসগার্ডের প্রতিযোগিতার কথা তাদের জানিয়ে লোকি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "দেখো তোমরা কদ্দূর কি করতে পারো। ইভালডির ছেলেরা তো তোমাদের নামে যা নয় তাই বলল। বলে একটা সামান্য গাঁইতি তৈরি করতে যাদের হাত কাঁপে তারা নাকি বানাবে দেবতাদের উপহার! তবে আমি চাই যেন জয় তোমাদেরই হোক।"
দুই ভাইয়ের মধ্যে ঈত্রি ছিল দুর্দান্ত কারিগর কিন্তু ব্রক্ ছিল অত্যন্ত চতুর। লোকিকে সে জিজ্ঞেস করল, "কি ব্যাপার লোকি? আমাদের জন্য দরদ দেখছি একদম উথলে উঠছে! এর ভেতরে তোমার কোনো গল্প নেই তো?"
লোকি সাধাসিধে নিষ্পাপ মুখ করে বলল, "ইয়ে, কই? না তো।"
ব্রক্ লোকিকে বলল, "আচ্ছা ঠিকাছে লোকি। আমরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেবো কিন্তু যদি আমরা জিতি তবে তোমার মুন্ডুটা কিন্তু আমার চাই। তোমার এই মুন্ডুটা এক আশ্চর্য জিনিস লোকি। সবসময় জটিল কুটিল চিন্তাভাবনায় ঠাসা। ওটি দিয়ে আমি আর ঈত্রি একটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করতে সক্ষম যন্ত্র বানাবো।"
ভেতরে ভেতরে চটে গেলেও লোকি কাষ্ঠ হেসে বলল, "হেঁহেঁ, ঠিকাছে। তাই হবে এখন।"
ব্রক্ আর ঈত্রি যখন দেবতাদের উপহার তৈরি করা শুরু করবে ঈত্রি তার ভাইকে দেবে হাপর ঠেলার ভার। লোকি নানাভাবে তাদের কাজ পন্ড করার চেষ্টা করবে। অনেকটা টাইপ করতে হবে বলে সে গল্পে আর যাচ্ছি না। মোট কথা, লোকি মস্তবড় একটা ভীমরুলের রূপ ধরে গিয়ে ব্রকের কপালে এমন জোর কামড়াবে যে তার হাত নড়ে হাপর থেকে যতটা হাওয়া বেরনোর কথা সেই মাপে গণ্ডগোল হয়ে যাবে আর তাদের শেষ উপহারটায় খুঁত রয়ে যাবে।
মহা খুশি হয়ে লোকি আসগার্ড ফিরে এসে ধুমধাম করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করল। লোকির মনমেজাজ বেশ ফুরফুরে কারণ সে জানে ব্রক্ আর ঈত্রির জেতার সুযোগ সে পন্ড করে দিয়েছে আর বউয়ের সোনার চুল দেখে খুশি হয়ে থর ইভালডি পুত্রদেরই বিজয়ী ঘোষণা করবে। সুতরাং বাজি হেরে মুন্ডুর হারানোর কোন ভয় তার নেই। যথাসময়ে সব কারিগররা এসে দেবাদিদেব ওডিন, বজ্রের দেবতা থর আর রূপবান ফ্রে'র সামনে তাদের উপহার পেশ করতে লাগল।
ইভালডির পুত্ররা প্রথমে ওডিনের সামনে পেশ করল একটি সোনার ঝকঝকে বালা। প্রতি নবম রাত্রিতে ওই বালা থেকে আটটি করে সমান মাপের ও মানের বালা ঝরে পড়বে, যা ওডিন নিজের সম্পদ বৃদ্ধিতে বা কাউকে উপহার দিতে কাজে লাগাতে পারবেন। থরের সামনে তারা নিবেদন করল অপূর্ব সুন্দর সোনার চুল যা সিফের মাথায় সুন্দরভাবে একেবারে গোড়া থেকে বসে গেল। ফ্রে কে তারা দিল পশমের একটি রুমাল যা ভাঁজ খুললেই দুর্দান্ত একটি জাহাজে পরিণত হয় এবং তা জল, স্থল ও আকাশ সব জায়গাতেই চলতে পারে।
উপহার পেয়ে দেবতারা সকলেই খুব খুশি হলেন।
এবার পালা ব্রক্ ও ঈত্রির।
ওডিনকে তারা উপহার দিল একটি বর্শা যা সমস্তকিছুকে ভেদ করতে সক্ষম আর কখনো তা লক্ষ্যচ্যূত হবে না। ফ্রে'র জন্য তারা এনেছিল একটি স্বর্ণবরাহ যার দাঁতগুলো অন্ধকারে জ্বলে আলো দেখাবে আর বরাহটিকে রথের সাথে জুড়লে জগতের সবচেয়ে দ্রুতগামী যানে পরিণত হবে।
সর্বশেষে এল থরের উপহারটির পালা যেটি তৈরির সময়তেই লোকির শয়তানিতে খুঁত রয়ে গিয়েছিল। লোকি তো মনে মনে খুব খুশি।
ব্রক্ বলল, "দেবতাদের সামনে আমি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারণ আমার হাত কেঁপে গিয়ে এই উপহারটিতে একটু খুঁত রয়ে গেছে। আমার ভাই ঈত্রির তৈরি এই উপহার মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মের মর্যাদা পেত যদি না আমার হাত কেঁপে যেত।"
থর অধৈর্য্য হয়ে বলল, "ঠিক আছে, ঠিক আছে। আগে দেখাও তো তোমার উপহার।"
রেশমের ঢাকা সরিয়ে ব্রক্ আর ঈত্রি থরের সামনে রাখল একটি হাতুড়ি। মাথাটা বড় কিন্তু হাতলটা ছোট।
ব্রক্ বলল, "আমার দোষে এর হাতল কিছুটা ছোট হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু এই হাতুড়ি হল সর্বলোকের সর্বশক্তিমান অস্ত্র। এর নাম ম্যলনির (Mjolnir)। যত জোরেই যা কিছুকেই আঘাত করুন না কেন এই হাতুড়ি ভাঙবে না। আর যেখানেই ছুঁড়ুন না কেন এ হাতুড়ি সবসময় আপনার হাতেই ফেরত আসবে।"
মহাশক্তিমান থরের হাতে কোন অস্ত্রই টিকত না। থর যে কতবার জোরে আঘাত করতে গিয়ে অস্ত্র ভেঙেছে আর শত্রুদের ছুঁড়তে দিয়ে অস্ত্র হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তাই এই হাতুড়ির গুণাবলি শুনে আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে থর হাততালি দিয়ে উঠল। দেবতারা সকলে একমত হয়েই ব্রক্ আর ঈত্রিকে কারিগরশ্রেষ্ঠ ঘোষণা করলেন। এই হল থরের হাতুড়ি ম্যলনিরের ইতিহাস।
লোকি আর তার মুন্ডুর কি হল? চালাকি পেয়েছেন? সব আমি বলে দেব? গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে বই পত্তর কিনে পড়ুন জেনে যাবেন।


আজ দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টি হবে। ইস্কুল দু'পিরিয়ড আগেই ছুটি হবে। সপসপে কাকভেজা হয়ে সাইকেল রেস হবে। রাস্তা, মাঠ, পুকুর সব এক হয়ে যাবে। ঝকঝক করবে কালো পিচরাস্তা, ফাঁকা।
বাড়ি ফিরে খাতা বইগুলো পাখার নীচে মেলে দেওয়া হবে। 
ভাত খেতে বসে লাউ থেকে চিংড়িগুলো বেছে বেছে আলাদা করা হবে। কোনমতে নাকে মুখে ভাত গুঁজেই জার্সি গলিয়ে মাঠে ছোটা হবে।
বর্ষার প্রশ্রয়ে বেপরোয়া বেড়ে ওঠা সবুজ ঘাসের গোড়ায় এক গোড়ালি জল থাকবে। একপাল ছেলে থাকবে। ফার্স্টবয় নীলু থাকবে, চায়ের দোকানের রতনও থাকবে। পনেরো টাকার একটা পাওয়ার বল থাকবে। উইকেট পুঁতে গোলপোস্ট সাজানো হবে। হুটোপাটি, হুড়োহুড়ি, জড়ামড়ি, ধস্তাধস্তি। আহ! হেবি মস্তি। ভেজা ঘাসে স্লাইড মারা হবে। হলুদ, সাদা, নীল জার্সিগুলো কাদা মেখে ভূত সাজবে।
ঘন কালচে মেঘের শামিয়ানার নীচে বৃষ্টিধোয়া গাছপালা ঝলমলে সবুজ। পুকুরের ওপর ঝুঁকে পড়া নারকেল গাছটার ওপর দাঁড়িয়ে ঝাঁপ মারা হবে। ঝুপ ঝুপ ঝুপ ঝুপ। কালো স্থির জল তোলপাড়। এপার ওপার, দাপাদাপি। 
বাড়ি ফেরার গলি রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে হলদে আলোগুলো জ্বলে উঠবে। নতুন গজিয়ে ওঠা কংক্রিটের পাহাড়গুলো থাকবে না। রাস্তার ধারে ঝোপঝাড়, আগাছায় ভরা অন্ধকার জমি থাকবে। বড় বড় গাছ থাকবে। কাছে দূরে পরপর শাঁখের আওয়াজ শোনা যাবে। রাস্তার পাশের জানলা দিয়ে সিরিয়ালের চেনা গান কানে আসবে। ধুপের গন্ধে মন কেমন করে উঠবে।
দিদার বাড়ির খাটে কোয়েশ্চেন ব্যাঙ্ক খুলে বসা হবে। প্রদীপ দেখিয়ে দেখিয়ে দিদুন সন্ধে দিতে আসবে, নকুলদানা দেবে। এ প্লাস বি হোল স্কোয়্যার থেকে কখন কি জানি খাতার পেছনে কুট্টুসের ল্যাজ, ওবেলিক্সের ভুঁড়ি, পিকাচুর কান আর প্রফেসর শঙ্কুর দাড়ি আঁকা হয়ে যাবে। পেছনের জমিটা থেকে একটু গ্যাঙোর গ্যাঙোর, একটু ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ কানে আসবে।
দিদুন টেবিলে লুচি আর আলু ছেঁচকি রেখে ডাকবে। থালাটা জোর করে খাটে নিয়ে এসে আনন্দবাজার পেতে বসা হবে। খেলার খবরে চোখ আটকে যাবে। স্কুলে টিফিনে হজমি খেতে খেতে গৌরবের সাথে আড্ডার কথা মনে আসবে।
- ভাই, রোনাল্ডোকে সবাই 'মোটা' 'মোটা' বলে খুব অপমান করছে রে। চিন্তা হচ্ছে।
Gourab গম্ভীর হয়ে বলবে - চাপ নিস না, ওটা রোনাল্ডো।
লুচি খেয়ে ভূগোলের শর্ট কোয়েশ্চেন লিখতে বসলে তেলতেলে আঙুল থেকে পেন হড়কে হড়কে বেরিয়ে যাবে। দিদুন এসে সুনীল গাঙ্গুলি বা আশাপূর্ণা খুলে বসবে। লিখতে লিখতে সাবান দিয়ে তিনবার হাত ধুতে উঠতে হবে, একবার হিসি করতে, দুবার জল খেতে। দিদুন রান্নাঘরে গেলে চুপিচুপি হাত বাড়ানো হবে। ফোন না, লাইব্রেরি থেকে আনা হেমেন রায়ের বইটা হাতে উঠে আসবে। মাছের চপে কামড় বসিয়ে সুন্দরবাবু বলবেন 'হুম'। বইটার একটা কোণা উইপোকাতে খাওয়া।
ভৌতবিজ্ঞান বইতে লুকিয়ে জয়ন্ত, মানিক, বিমল, কুমারের সাথে কয়েক ঘন্টা এডভেঞ্চার হবে। ঘড়ির দিকে চোখ যেতেই আঁতকে উঠে টিভির রিমোট খোঁজা হবে। গোলগোল চোখ করে একটা বছর বারোর ছেলে টিভির সামনে বসে দাঁত দিয়ে নখ চিবোবে। টিভির অত সামনে বসিস না - ধমক খাবে।
হলুদ ন'নাম্বার জার্সি পরা একটা ন্যাড়া মাথা মোটা আনফিট লোক যার দুপায়ে অসংখ্য অপারেশন - কাকার বাড়ানো থ্রু বলটা ধরে ঘানার গোলকিপারের সামনে ইনসাইড-আউটসাইড করে মাটিতে বসিয়ে, ঘাড়ের ওপরের মুশকো ডিফেন্ডারটাকে পাশে ছিটকে দিয়ে আউটস্টেপের টোকায় জালে বল জড়িয়ে দেবে - নিষ্পাপ শিশুর মত তার একগাল হাসি। ক্লাস সেভেনের একটা ছেলের গায়ে কাঁটা দেবে, কান গরম। বাড়ির লোকের সামনে চোখের জল চাপার প্রাণপণ চেষ্টায় গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করবে।
এক ছুটে ওপরের লম্বা বারান্দায় গিয়ে ফুটবলটায় আনন্দে দুম দুম করে দুটো তিনটে শট মারা হবে। অত রাত্তিরে সারা বাড়ি কেঁপে উঠবে। মা চ্যাঁচাবে। গুটি গুটি পায়ে নীচে আসা হবে।
জানলার বাইরে আবার ঝিরঝির করে ইলশেগুঁড়ি শুরু হবে। ল্যাম্পপোষ্টের আলোরা আবছা। এ মাসের আনন্দমেলাটা পড়তে পড়তে চোখ জুড়িয়ে আসবে। কাল সকালে আবার ইস্কুল আছে।
কাল দুপুরেও মুষলধারে বৃষ্টি হবে।



শহরটা আজ শ্মশান। দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজে যতদূর চোখ যায় গাড়ির লাইন। তাড়াহুড়োয় দুটো ট্রাক উলটে ব্রিজের মাঝখানে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। গাড়ি আর এগোচ্ছে না। গাড়ি থেকে নেমে পড়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে কাতারে কাতারে মানুষ। পালাচ্ছে। কাঁদছে। আর্তনাদ করছে প্রাণভয়ে। হোঁচট খেয়ে, মুখ থুবড়ে পড়ছে, মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ছে দুধের শিশু, বুড়োটার মুখ পিষে দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ভারী জুতো। প্রাণের ভয়ে। স্রেফ প্রাণের ভয়ে। মাটির ঢিপি ভাঙা পিঁপড়ের সারির মত পিলপিল করে ছুটছে ভয়ার্ত মানুষ। পালিয়ে যাবে কোথায়? মৃত্যু যে আসন্ন।

থ্যানোস এসে গেছে। পাশ্চাত্যের দর্প চূর্ণ করে থ্যানোসের পা পড়েছে উপমহাদেশের মাটিতে। আয়রন ম্যান, স্পাইডার ম্যান, ক্যাপ্টেন আমেরিকা, ব্ল্যাক প্যান্থারের মত অতিমানবদের জয় করে থ্যানসের রণতরী আকাশগঙ্গা বেয়ে নোঙর করেছে কলকাতার আকাশে। পাহাড়প্রমাণ পাগল টাইটান থ্যানোসের হাতে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী অজানা এক ধাতুর তৈরি দস্তানা - ইনফিনিটি গন্টলেট। তাতে বসানো সাতটি ইনফিনিটি স্টোন - মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাতটি রত্ন। এর বশেই আজ ব্রহ্মাণ্ড জয়ের স্বপ্ন দেখছে থ্যানোস।
'সিটি অফ জয়' আজ 'সিটি অফ টেরর'। ধ্বংস হচ্ছে ইমারতের পর ইমারত, গুঁড়িয়ে যাচ্ছে সৌধ, মনুমেন্টের মাথা ছাড়িয়ে আকাশে উঁকি দিচ্ছে বহ্নিশিখা। অতঙ্কিত শহরবাসী সভয়ে শুনছে থ্যানসের উন্মাদ রণহুঙ্কার, "পৃথিবী আমার, এই সৌরজগৎ আমার, গ্যালাক্সি, এই ইউনিভার্স সব আমার।"
বঙ্কুবাবু এখন শিবপুরে গঙ্গারধারে বস্তির পাশে একটা ছোট্ট সরকারি ইস্কুলের হেডমাস্টার। বাকি যেকজন মাস্টার আছে তারা স্কুলে হাজিরা দিয়েই বাইক নিয়ে ছোটে টিউশন দিতে। বঙ্কুবাবু একাই অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, বাংলা, ইংরিজি সবই পড়ান। ছাত্রসংখ্যা কম বলেই পেরে ওঠেন। স্কুলের ছাদে দাঁড়িয়ে গঙ্গার ওপারে থ্যানোস আর তার বাহিনীর তান্ডব দেখছিলেন তিনি। শুধু ধোঁয়া আর আগুনের শিখা। মানুষের পর মানুষ প্রাণভয়ে ঝাঁপ দিচ্ছে গঙ্গায়। বিস্ফোরণ আর অগণিত মানুষের কান্নার আওয়াজ গঙ্গার এপারেও এসে পৌঁছচ্ছে। এসব দেখে তিনি মোটেও বিচলিত হলেন না। এ হওয়ারই ছিল। এমনিতেই তো মানুষের বিবর্তন পশ্চাদপসরণ করেছিল অনেকদিন ধরেই। এর ওর টিকি, দাড়ি টানাটানি আর মন্দির মসজিদ ভাঙাভাঙি ছাড়া আর তো বিশেষ কোন কাজ ছিল না লোকজনের। দেশটা এমনিতেই নরকের দরজার এসে কড়া নাড়ছিল। সেই কাজটাই থ্যানোস আসতে তাড়াতাড়িই ঘটে যাচ্ছে। ভাল, ভাল। শুভস্য শীঘ্রম।
সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগলেন বঙ্কুবাবু। মানুষ জাতটার ওপরেই তার ঘেন্না ধরে গেছে। কদিন আগে এক প্রাক্তন ছাত্র তাঁকে একটা স্মার্টফোন গিফট করে ফেসবুক জিনিসটা শিখিয়ে দিয়েছিল। প্রথমদিকে মন্দ লাগেনি। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা পুরনো ছাত্রটাত্রদের সাথে কথা টথা বলা যায়। তাঁর কম বয়সের কবিতা লেখার শখটাও চাগাড় দিয়ে উঠেছিল। লোকজনের 'আপনার এই লেখাগুলোর জন্যই বেঁচে থাকা', 'সমৃদ্ধ হলাম', 'কি করে লেখেন এত ভাল?', 'পরের বইমেলায় দু'মলাটে পাচ্ছি তো?' ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর মন্তব্য পড়ে মাঝেমধ্যে তাঁর নিজেরই নিজের পিঠ চাপড়াতে ইচ্ছে করত। কিন্তু যতদিন যেতে লাগল শিউরে উঠতে লাগলেন। কাঁকুড়গাছিতে থাকাকালীন একবার একটা চোরকে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে ঠান্ডা মাথায় পিটিয়ে মারা হচ্ছিল দেখে অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন বঙ্কুবাবু। তিনদিন জ্ঞান ছিল না তাঁর। ফেসবুকেও সেই জিনিসটার ছায়া ইদানীং বড্ড মনোকষ্ট দিচ্ছে তাঁকে। কারো সাথে মতের অমিল হলেই, কেউ ভুলবশত ছোটখাটো বেফাঁস কথা বলে বসলেই খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে তার ছাল ছাড়ানো হচ্ছে। ফেসবুক খুললেই সেই ল্যাম্পপোস্টে বাঁধা রক্তাক্ত চোরটার যন্ত্রণকাতর, বিহ্বল চাহনি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। এর থেকে শ্রীপতিবাবুদের আড্ডা অনেক ভাল ছিল। তারা বঙ্কুকে নিয়ে ছেলেমানুষি রগড় করত ঠিকই কিন্তু অমন কেউ ছিল না। তাই ফোনটাকে সেই যে দেরাজে ঢুকিয়ে চাবি দিয়ে রেখেছিলেন আর খোলেননি।
থ্যানোস পৃথিবী ধ্বংস করে ফেললেও বঙ্কুবাবুর কিছু যায় আসে না। গুণগুণ করে একটা শ্যামাসঙ্গীত গাইতে গাইতে অফিসঘরে ঢুকে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। উল্টোদিকের দেওয়ালে টাঙানো ফ্রেমে বাঁধানো স্বামী বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র বোসের সাথে চোখাচোখি হতে ভারী অপ্রস্তুতে পরে গেলেন বঙ্কুবাবু। বাঙালী হিসেবে তাঁর বড্ড লজ্জা করল। নাহ, মানুষের স্বার্থে না হোক এই গ্রহটার জন্য অন্তত কিছু একটা করা দরকার। হাজার হোক নীলতিমি, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, হাতি, সিংহ, ভাল্লুক, টুনটুনি পাখি, চমরীগাই মায় পিরানহা মাছ থেকে মশামাছি পর্যন্ত কোটি কোটি নিরপরাধ প্রাণীকে বেঘোরে মরতে দেওয়াটা উচিত হবে না। যাই হোক, ওরা তো আর মানুষের মত ত্যাঁদোড় অসভ্য নয়। আর থ্যানোসের সাথে এঁটে উঠতে না পারলেও একবার অন্তত একটু প্রতিবাদ করেই না হয় দেখা যাক। সারা জীবনটায় তো আর কিছুই হল না। ইঁদুরের মত গর্তে লুকিয়ে পুড়ে মরার চেয়ে বীরের মৃত্যু ঢের ঢের সম্মানজনক।
*****
বিকেলের সূর্য পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়েছে। আকাশ টকটকে লাল। গড়ের মাঠে হাজার হাজার মানুষ দৈত্যাকৃতি থ্যানোসের পায়ের কাছে সারিবদ্ধভাবে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। থ্যানোসের সৈন্যরা ধরে এনেছে এদের। গমগমে গলায় হুঙ্কার ছাড়ল থ্যানোস, "শোনো পৃথিবীবাসী। আজ থেকে তোমাদের ছোট্ট গ্রহের মালিক আমি। বাঁচতে যদি চাও আমার ক্রীতদাস হয়ে থাকতে হবে। হুকুম অমান্য করার শাস্তি একটাই - মৃত্যু।"
হাঁটু গেড়ে বসা ক্লান্ত, সন্ত্রস্ত মানুষগুলো মাথা নীচু করে থরথরিয়ে কাঁপছিল। ভিড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ একটা গলা শোনা গেল। ব্রহ্মান্ড বিজয়ী দুরন্ত থ্যানোস অবাক হয়ে দেখল ধুতি আর শার্ট পরা একটা রোগামত বেঁটেখাটো বুড়ো লোক "এই যো" বলে হাত তুলে তাকে ইশারা করছে।
"ইয়ে বলছি যে এখানে আপনি বিশেষ সুবিধে করতে পারবেন না। যেখান থেকে এসছেন সেখানেই ফিরে যান। ক্ষয়ক্ষতি সব না হয় আমরা মাফ করেই দেবো।"
গর্জে উঠল থ্যানোস। বাজ পড়ল যেন। এই তুচ্ছ মানুষটার এত স্পর্ধা! ডান হাতের ইনফিনিটি গন্টলেটটা তুলে তাক করল থ্যানোস। বঙ্কুবাবু সভয়ে চোখ বুজলেন। চোখের পলক পরার আগেই তার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা। কি হল! বেঁচে আছেন বলেই তো বোধ হচ্ছে। ভয়ে ভয়ে একটা চোখ খুললেন। তারপর আর একটা। বঙ্কুবাবু দেখলেন থ্যানোস অবাক হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে। ধাতুর দস্তানায় একটাও রত্ন আর অবশিষ্ট নেই। গর্তগুলো ফাঁকা! পাগল টাইটানের মুখ দিয়ে কিছুক্ষণ কোন কথা বেরোল না।
তারপর প্রচন্ড ক্রোধে থ্যানোসের তার অতিকায় মুঠো ছুঁড়ে দিল বঙ্কুবাবুকে পিষে ফেলার উদ্দেশ্যে।
বিস্ময়ে হতবাক থ্যানোস দেখল সে নড়তে পারছে না। তার সৈন্যরাও পাথরের মূর্তির মত অবিচল।
বঙ্কুবাবুকে আড়াল করে থ্যানোসের সামনে শূণ্যে ভাসমান একটা ছোট্ট স্পেসশিপ। চালকের আসনে বসে আছে অদ্ভুতদর্শন একটা প্রাণী। লিকলিকে হাত পা, মাথাটা দেহের তুলনায় বড়, দুটো চোখ দিয়ে যেন আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। গায়ে চকচকে পোশাক দিয়ে হালকা গোলাপী আভা বেরোচ্ছে।
বঙ্কুবাবু আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলেন, "অ্যাং!"
কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল থ্যানোস।
- "মহারাজ অ্যাং! আ-আপনি!"
- "কি ব্যাপার থ্যানোস? তুমি নাকি ব্রহ্মাণ্ড জয় করবে?"
- "ক্ষমা করে দিন মহারাজ। আমি এক্ষুনি ফিরে যাবো। দয়া করে আমাকে নির্বাসনে পাঠাবেন না।"
- "আর এই ধ্বংসের হিসেব কে দেব? এতগুলো প্রাণের মূল্য কি তুমি চোকাতে পারবে থ্যানোস?"
- "কিন্তু এরা যে ইতর প্রাণী। এরা হিংস্র, এরা নিজেদের মধ্যেই খেয়োখেয়ি করে শেষ হয়ে যাবে। এদের প্রাণের মূল্য নেই। আমি গ্রহটার বিশুদ্ধি করতে চাই। আমি এদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করবো।"
- "যতদিন জানিবে বঙ্কুর মত একজনও মানুষ বেঁচে আছে, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর, সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার ক্ষমতা রাখে ততদিন এই গ্রহের মৃত্যু নেই। এদের এই বৈশিষ্ট্যটাই আমাকেও অবাক করে থ্যানোস। অন্যায়ের সাথে আপোস এরা করে না। অত্যাচারীর অধীনতা মানে না।"
- "ক-কিন্তু....."
- "ভাগ্যিস অনেক দিন পর আমার বন্ধুর সাথে দেখা করতে আসছিলাম। নইলে তো জানতেও পারতাম না তুমি এখানে এই কীর্তি ঘটাচ্ছ।"
- "ক্ষমা.... ক্ষম...."
কথাটা শেষ করার আগেই অ্যাং এর এক তুড়িতে ভ্যানিশ হয়ে গেল থ্যানোস। তার রক্তলোলুপ সৈন্যদলও।
বঙ্কুবাবুর দিকে ফিরে ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং বলল, - "কি বঙ্কু? ভাল আছ?"
- "অ্যাং তুমি মানে আপনি রাজা! এই ব্রহ্মান্ডের রাজা!" কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন বঙ্কু।
স্পেশশিপ থেকে নামতে নামতে অ্যাং বলল,
"তোমার জন্য স্রেফ বন্ধু। এর বেশী আর কিছু না। 'তুমি'টাই থাক না। আবার 'আপনি' কেন? আর ব্রহ্মান্ড মাপার ক্ষমতা আমাদেরও নেই। তোমাদের চেনা ইউনিভার্সের ওই ধরো এক তৃতীয়াংশের দেখাশোনা করি আমি।"
কৃতজ্ঞতায়, আবেগে চোখে জল এল বঙ্কুবাবুর। বন্ধুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি।
জমায়েত মানুষজন জয়ধ্বনি করে উঠল তাদের ঘিরে।
- "কিন্তু ওই পাথরগুলো কোথায় গেল বল তো বঙ্কু? আবার কোনো শয়তানের হাতে পড়লে মহা মুশকিল। থ্যানোসের হাত থেকে তার নাকের ডগা দিয়ে কে হাতিয়ে নিল!"
বঙ্কুবাবু জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, "ভগবান যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন।"
*******
কালো চামড়ার বুট পরা দু'জোড়া পা সন্ধেবেলা গঙ্গার ধার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। বেঁটে লোকটার হাতে কালো কাপড়ে মোড়া একটা হরলিক্সের শিশি। কালো কাপড়টা সরিয়ে নিলে দেখা যাবে ওই শিশির ভিতরেই আছে পাথরগুলো।
চামড়ার জ্যাকেট পরা লোকটা বলে উঠল,
- "মনটা বড্ড ছোঁক ছোঁক করচে বুজলেন মশাই...."
সাহেবি টুপি মাথায়, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি উত্তরে প্রশ্ন করল, - "কেন? আবার কি হল?"
- "বলচি যে কাজটা ঠিক হল তো? মানে ওই থ্যানোস না ধ্যানোস কোন ঠাকুর দেবতার অবতার টবতার নয় তো? যদি ধাঁ করে শাপ টাপ দিয়ে দেয়...."
- "ইডিয়টের মত কথা বোলো না তো। চুপচাপ চলো। আমি স্রেফ অবাক হয়ে যাচ্ছি তুমি তার হাত থেকে ইনফিনিটি স্টোনগুলো হাতালে কি করে?"
- "হেঁহেঁ.... ছেলেবেলা থেকে ধর্মতলায় পকেট মারচি। পুলিশ টুলিশ কেউ বাদ গেল না। আর ওই থ্যানোস.... ছো:!"
- "নাহ, এত বছর পর মানতেই হচ্ছে যে তোমার বেশ এলেম আছে।"
- "কিন্তু বলচি কি মশাই পাথরগুলো হাতছাড়া করা কি ঠিক হচ্চে? মগনলাল মেঘরাজ কিন্তু কয়েক কোটি দেবে বলে..... আর সবুজ পাথরটা দেখে মনটা কিরম ছুকছুক কচ্চিল। একটা আংটি বানিয়ে পরলে মন্দ হত না।"
কটমট করে তাকাল ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি।
- "সারাজীবনে কি কম পাপ করেছ? পাপের বোঝাটা একটু হালকা করার চেষ্টা করো এবার।"
- "হ্যাঁ তা ঠিক, পাপ করে করেই জীবনটা গেল.... মাঝেমাঝে নিজের ওপরই ভারী ঘেন্না হয়।"
গঙ্গার ধারে পৌঁছে একটা নিরিবিল জায়গা দেখে দাঁড়াল দুজন। এদিক ওদিক দেখে নিয়ে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি হাতের হরলিক্সের শিশিটাকে ছুঁড়ে দিল গঙ্গায়।
- "ব্যাস, এবার সিধে....."
- ".....বঙ্গোপসাগর, তারপর ভারত মহাসাগর।"
- "বাবা! পেটে পেটে এত বিদ্যে!"
- "আরে মশাই ভুলে গেলেন? ম্যাট্রিকে ছাপ্পান্ন পেয়েছিলুম.... ভূগোলে।"
দুজনেই হেসে উঠল। তারপর আর একবার এদিক ওদিক দেখে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চৌরঙ্গীর ভিড়ে মিশে গেল মন্দার বোস আর অমিয়নাথ বর্মন।

Saturday, 14 October 2017

তৃষ্ণা (তৃতীয় পর্ব)

তৃষ্ণা (তৃতীয় পর্ব)  - নির্বাণ
[এটা অবশ্যই আলো নিভিয়ে পড়বেন]
বিশু কোনোদিনও বরফ দেখেনি। পন্ডিতমশাই বলে নাকি খুব ঠান্ডা, কনকনে - হাতে রাখা যায় না বেশীক্ষণ, খুব টনটন করে। আঙুলের ডগাগুলো নাকি শিবঠাকুরের গায়ের মত কটকটে নীল হয়ে যায়। বিশু শিবঠাকুর দেখেছে। মুনষির হাটের চরকের মেলায়। গায়ে বাঘছাল, একহাতে ত্রিশূল আর অন্যহাতে ডুগডুগি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচ দেখিয়েছিল। খয়েরি সিঁদুরে ধুলো ওড়ানো নাচ। গলায় মোটা মোটা রুদ্রাক্ষের মালা, মাথায় বিশাল জটা আর গলায় জড়ানো মস্ত একটা সাপ। সবাই পয়সা ছুঁড়ছিল। কেউ বা কলাটা মুলোটা নামিয়ে রাখছিল মাটিতে। নাচ থামিয়ে ভামবেড়ালের ওঁৎ পাতা কায়দায় বসেছিল ঠাকুর থাবা গেড়ে। বুকটা উঠছিল নামছিল হাপরের মত হা হা করে। সাবানের সাদা ফ্যানার মত গ্যাঁজলা দেখেছিল ঠোঁটের কোণে। কাঁপা কাঁপা হাতে বিশু দুটো মেটে আলু নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল দেবে বলে - শিবঠাকুরের দখখিণে। লাল টকটকে দুটো চোখ। গাঢ় নীল ঘাড় গলা জড়িয়ে চকচকে কালো সাপটা ফোঁস করে উঠেছিল ফণা তুলে, হঠাৎ চমকে থরথরিয়ে কেঁপে উঠেছিল এগারো বছরের বিশে। ঘন নীল মুখে করমচা লাল টকটকে চোখজোড়া ওপর দিকে আদ্দেক তোলা - শিবনেত্তর।

বিলের অন্ধকার জলে ডুব গেলে গেঁড়ি তুলে আনে বিশু। ডুব সাঁতারে চরণির বিল এপার ওপার করে বছর এগারোর ছেলেটা। জলের তলাটা কি ঠান্ডা আর কালো! আচ্ছা বরফ কি এর চেয়েও বেশী ঠান্ডা? ডুবতে ডুবতে অবাক হয়ে বিশু ভাবতে থাকে। কালো জলের গভীরে কোনো শব্দ নেই, থমথমে চুপচাপ। পাকা মাগুরের মত জল কেটে এঁকেবেঁকে সাঁতরাতে থাকে। গাঁয়ের লোক বলে নাকি বিলের নীচে কয়েকশো মড়া বাচ্ছা পোঁতা আছে। ঠান্ডা জোলো আঁশটে অন্ধকারে চোখ চেয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করে ছোট্ট বিশু। কয়েকশো মানে কত? পঁচিশের চেয়েও বেশী? অবাক হয়ে ভাবতে ভাবতে গা ছমছম করে ওঠে বিশুর। তলার হড়হড়ে শ্যাওলা কাদায় হাত, পেট ঠেকে; পাঁচ সেরি পাকা কাতলার পিঠের মত কালো জল। বুকের ধুকপুকুনি মোটে থামতে চায় না। কিরকিরে কাদা সমেত একমুঠো গেঁড়ি তুলে নিয়ে ওপর দিকে শরীর ছেড়ে দেয় বিশু। হুহু করে উঠতে থাকে ওপরের দিকে। ছোট্ট মাথাটা ভুস করে ভেসে ওঠে জলের ওপর। বড় হাঁ করে হাওয়া গেলে সে। ছোট্ট বুকটা উঠছে নামছে - শিবঠাকুরের মত। ঘন কালচে নীল আকাশের পশ্চিমে একটুকরো টকটকে লাল কয়লায় মত সূর্য ভাসে বোসেদের বাঁশঝাড়ের মাথায়। যদ্দূর চোখ যায় কোনো মানুষের চিহ্ন নেই।
মাথার ওপর দিয়ে বকের ঝাঁক উড়ে যায়, ডাহুকের ডাকের সাথে সাথে লাল কয়লার ডেলাটাকে গিলতে থাকে চরণির ঝিল যার নীচে নাকি কয়েকশো মড়া বাচ্ছা পোঁতা।
সাঁতরে পাড়ের দিকে এগোয় শ্যামা বাগদির ব্যাটা বিশু। বাপকে বিশু দেখেনি। শ্যামা নাকি ছিল দুঁদে লাঠিয়াল; আশে পাশের পঞ্চাশটা গাঁয়ের লোক একডাকে চিনত। অনেকে বলে শ্যামা বাগদি নাকি ডাকাত ছিল। ধরা পড়ে কালাপানি হয়েছে নয়তো ফাঁসি গেছে। কেউ তো বলে দলের লোকরাই হাত পা বেঁধে জ্যান্ত পুঁতে দিয়েছে এই চরণির বিলের কাদাতেই।
বামুন কায়েতের গাঁয়ের বাইরের দিকে বিশুদের চালাঘর - চরণির বিল আর বোসেদের বাঁশবাগানের মাঝে। কয়েকশো বিঘের জলা জমিতে শাপলা ফলে। গেঁড়ি গুগলি, ছোট মাছ, বড় মাছ, কাদা চিংড়ি। পাঠশালা থেকে বেরিয়ে চরণির ঝিল দাপিয়ে এটা সেটা তুলে ঘরে নিয়ে আসে বিশু। মাটির হাঁড়িতে বেধবা মা মেটে আলুর ঝোল রাঁধে। অল্প তেল দিয়ে কাদা চিংড়ির চচ্চড়ি আর লালচে মোটা চালের ভাত। বিশুর কি ভালোই না লাগে!
গেঁড়িগুলোকে কোঁচড়ে বেঁধে বিলের ধারে হাঁটু কাদায় নীচু হয়ে ঝুঁকে শাপলা তুলছিল বিশু। জোঁক লাগে হাতে পায়ে মাঝে মাঝে, কাদাজমি জোঁকের আড়ত। টানলেও ছাড়ে না। বাড়তে থাকে চামড়ার ফিতের মত। বাড়ি গিয়ে রক্তচোষাদের মুখে নুন ছড়িয়ে দিলেই টুপটাপ খসে পড়ে ছটফটিয়ে রক্ত উগড়ে শেষ।
আজ অবশ্য বিশুরা বাড়িতে দুজন নয়। গতকাল থেকেই নয়। ভিনগাঁয়ের এক বামুন বউ এসে উঠেছে তাদের মাটির ঘরে। গতকাল ভোরে, যখন আকাশের কালো কেটে একটু একটু উনুনের ছাইয়ের মত রঙ হয় চাদ্দিকটা, প্রথম শালিক কি ফিঙেটা যখন ডেকে ওঠে আঁধার কেটে তখন বিলের পাড়ে বসে কাঁদছিল নাকি বউটা। দুব্বো ঘাসের ওপর মুক্তোর মত গোটা গোটা জলের ফোঁটা। গুল দেবে বলে কাদা আনতে গেছিল মা বিলের ধারে। মায়ের বড় মায়া। শ্বশুরবাড়ির লোকে নাকি তাকে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। বামুনের মেয়ে তাদের ঘরে থাকবে? ভয়ে ভয়ে শুধোয় শ্যামা বাগদির বেধবা। এক কথায় রাজি হয়ে যায় বউটা। বিশুর মন্দ লাগে না। কেউ তো আসেনা তাদের ঘরে। মায়ে পোয়ে থাকে। ভালোই হবে। গপ্প টপ্প শোনা যাবে ভিনগাঁয়ের। বউটা ভারী রোগা, আর কি লম্বা! তাদের গাঁয়ের রঘু চৌকিদারের মত লম্বা। অবাক হয়ে দেখে শ্যামবর্ণ বিশু; কি সাদা গায়ের রঙ! কিন্তু মুখের কাছটা ভারী অদ্ভুত। চোঙাটে, নলের মত। খসখসে মায়া জড়ানো গলায় কাছে ডাকে বিশুকে, "কি সোনা ছেলে গো, আয় বাবা কাছে এসে বোস।" বিশুর ভারী মায়া লাগে। চোখদুটো কেমন যেন - খ্যাঁকশিয়ালের মত না? তাও বিশুর খুব মায়া লাগে। আহা রে, কেউ নেই বোধহয় অভাগীর। থাকুক না বিশুদের ঘরে।
হঠাৎ শেষ বিকেলের নিস্তব্ধতাকে চিরে বিশুর কানে একটা কান্নার আওয়াজ এসে বিঁধল। বাচ্ছার কান্না। বাঘের গন্ধ পাওয়া হরিণের মত চমকে বিলের দিকে তাকাল বিশু। কান্নার শব্দটা এগিয়ে আসছে বিলের ওপর দিয়ে। জলের ওপর দিয়ে। বাড়ছে। একটা, দুটো, তিনটে নয় - অনেক কচি বাচ্ছা যেন একসাথে কাঁদছে। ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া; বিশুর কান ফাটার জোগাড়। শেষ বিকেলের মরা বেগনে আলোয় কেউ কোত্থাও নেই। শকুনের বাচ্ছার ডাকের মত ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া। সর্বাঙ্গে একটা শিহরণ খেলে গেল শ্যামা বাগদির ব্যাটার। আওয়াজটা বিলের জল তোলপাড় করে বিশুর দিকেই এগিয়ে আসছে। শাপলা ফেলে বিশু কাদার মধ্যে দিয়েই হাঁচোড়পাঁচোড় করে গা মাথা মুখ কালো চটচটে করে উঠে দাঁড়াল শক্ত ডাঙায়। গাঁয়ের ছেলে বিশে। এই বয়সেই এমন অনেক কিছু দেখেছে শুনেছে যা শহরের লোকেদের বীভৎসতম কল্পনারও বাইরে। গায়ে কাঁটা দেয় বিশুর। মা শিখিয়েছে ভয় পেলেই কালো ছায়াগুলো আরো চেপে বসবে, রক্তচোষা জোঁকের মত। গাঁয়ের লোকে সবাই জানে বাঁশঝাড়ে, খালে, বিলে, জঙ্গলে, পুকুরে, বাগানে এমন অনেক জিনিস আঁধার মেখে লুকিয়ে থাকে যাদের দেখেও দেখতে নেই, শুনেও শুনতে নেই। ধুকুপুকুনি নিয়েও বুক চিতিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে রামনাম জপতে থাকে বিশু। কান্নাটা বাড়তে বাড়তে এগিয়ে এসে বিশুর একদম কাছেই থেমেছে। কান্নাটা আর কান্না নেই। অদ্ভুত যন্ত্রণাময় অপার্থিব একটা গোঙানি বিলের কাদায় ছটফট করছে। স্তম্ভিত বিশু দেখল বিলের কাদা যেন জ্যান্ত হয়ে উঠে রূপ নিয়েছে অসংখ্য সদ্যোজাত শিশুর। অসংখ্য জোঁকের মত কিলবিলিয়ে গাদাগাদি করতে থাকে তাদের কাদাশরীর। সাথে অস্ফুট গোঙানি। আর দাঁড়ায় না বিশু। পেছন ফিরে বাড়ির দিকে দৌড় লাগায়। মা বলেছে পেছনে ফিরে তাকাতে নেই।
বোসেদের বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে সরু পায়ে চলা কাঁচা রাস্তা চলেছে বিশেদের চালাঘরের দিকে। সক্কালবেলাতেই অন্ধকার ঘুটঘুট করে। ঝিঁঝিঁরা পালাগান শোনাতে বসে। সন্ধের সময় তো কথাই নেই। বিশু অভ্যস্ত। অন্ধকারে বিশুর চলতে অসুবিধে হয় না। পায়ে থপাথপ আওয়াজ তুলে বিশু এগিয়ে চলে কালো আলকাতরার মত অন্ধকার চিরে। চুপিসারে চললে সাপে কাটে। লাউডগা, কেউটে, শাঁখামুঠি - সাপের শেষ নেই দেশেঘরে। লতা লতা লতা।
বিলের জিনিস বিলেই থাকে - ধাওয়া করে না। বিশু জানে। বাঁশবাগানেও অনেক ভয়ের জিনিস আছে। শুধু ভয় না পেলেই হল। দূরে একটা শেয়াল ডাকে। বাঁশবাগানেরই দু তিন জায়গা থেকে সাড়া আসে। ডাক চলতেই থাকে। হুউউউউউউউউ...... হুউউউউউউ.....
মাটিতে আড়াআড়ি পড়ে থাকা বাঁশগুলো ডিঙোতে নেই। ঘুরে যেতে হয়। গাঁয়ের সবাই জানে। পা চালায় বিশু। মা এতক্ষণে মাটির হাঁড়িতে ভাত বসিয়ে দিয়েছে। ইশশশশ! শাপলাগুলো ফেলে এলো বিশু। তাও গেঁড়ির ঝাল দিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের চিন্তায় পেটের খিদে আরো চনচনিয়ে ওঠে বিশ্বনাথের। সামনে বাবলা গাছের ঝাড়টা পেরোলেই তাদের মাটির ঘর। সেই বামুন বউ কি করছে কে জানে!
বাবলা গাছটা পেরিয়ে থমকে দাঁড়াল বিশু। চারিদিকে জঙ্গলের মধ্যে ফাঁকা গোল পরিষ্কার জায়গাটায় তাদের কুঁড়েঘর। দাওয়ার ঠিক সামনে একটা তুলসীগাছ। সন্ধে হতেই মা তার সামনে তেলের বাতি জ্বালে। ঝকঝকে নিকোনো উঠোনে উনুনে আঁচ দেয় মা। কিন্তু আজ সব অন্ধকার। আলো জ্বলেনি। না ঘরে, না তুলসীতলায়, না উঠোনে।
বাবলা গাছের ডালে বসা প্যাঁচাটা বনবন করে মাথা ঘোরায়। পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে বিশু। চারিদিকে কালো কালো গাছের মাথার ভিড়ে খোলা একটুকরো গোল আকাশ। কদিন আগেই পূর্ণিমা গেছে। ক্ষয়াটে চাঁদের আলোর তেমন জোর না থাকলেও বিশুদের কাজ চলে যায়।
'মা' বলে ডাকতে গিয়েও থমকে যায় বিশু। ন্যাংটো বয়স থেকেই জলা জঙ্গল চষা অভ্যেস - ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন তাকে আওয়াজ করতে নিষেধ করে। ঠান্ডা লাগে বিশুর। কনকনে ঠান্ডা। বুকের ধুকপুকুনিটা আবার শুরু হয়ে যায়। সন্তর্পণে দাওয়ায় উঠে হালকা করে দরজা ঠেলে বিশু ঘরে উঁকি মারে। ফাঁকা। কেউ নেই। গলা শুকিয়ে কাঠ। অন্ধকার দাওয়ায় ভূতের মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বিশু। হঠাৎ খড়মড় আওয়াজ করে ঘরের পেছন দিক থেকে কি একটা ছুটে বেরিয়ে এসে সাঁৎ করে বাঁশবনে গিয়ে সেঁধোয়। খটাশ বা ভাম। ভয়ে পালাল। কেন? বিশু নিজের ইন্দ্রিয়কে অনুসরণ করে। মাটির কুঁড়ের বাঁ দিয়ে আস্তে আস্তে কোনো শব্দ না করে এগোতে থাকে ছোট্ট বিশ্বনাথ। ঘরের পেছনেই একটা ডোবা। চারিদিকে ঝোপ জঙ্গল। ঘরের মাটির ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এগোতে থাকে বিশু। একটা কালো মেঘ এসে কম্বলের মত চাঁদটাকে মুড়ে দিয়েছে।
ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের ডাকের সাথে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছে ঘরের পেছনদিক থেকে। গেলবারের বারোয়ারি কালীপুজোর ভোজে ঘোষালবুড়োর খাওয়া দেখেছিল বিশু। দাঁতছাড়া মাড়ি দিয়ে আজব কায়দায় পাঁঠার হাড় চুষছিল বুড়ো - সলাৎ সলাৎ করে আওয়াজ হচ্ছিল। অবাক চোখে চেয়েছিল সে।
আওয়াজটা কিছুটা সেরকমই কিন্তু আরো জোরালো - শুনলেই কিরম ভয় লাগে। ভয়ে অবশ শরীরটাকে কোনমতে ঝুঁকিয়ে ডোবার পাড়ে চোখ রাখল বিশু। ঝোপের পাশ থেকে দুটো পা বেরিয়ে, চিত হয়ে কেউ শুয়ে আছে। অল্প অল্প নড়ছে পা দুটো। অজানা ভয়ে বিশুর গলার কাছে একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠল। বাবলা গাছের কাছে একটা শেয়াল ডেকে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে রাম নাম জপতে জপতে ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল বিশু। চাঁদটা আবার আস্তে আস্তে উঁকি মারছে কালো মেঘের চাদর সরিয়ে। ঠান্ডা ঘামে ভেজা কাদা জড়ানো শরীরে চাঁদের আলো পড়ে প্যাঁকাল মাছের মত চকচক করছে তার গা।
ঝোপটা পেরোতেই চাঁদটাও পুরো বেরিয়ে এল আর এক বীভৎস উৎকট দৃশ্যে বিশুর মাথা বনবনিয়ে ঘুরতে লাগল। ডোবার দিকে মাথা আর বিশুর দিকে পা করে চিত হয়ে পড়ে আছে মা। মায়ের মাথাটা অদৃশ্য হয়েছে সেই বামুন বউয়ের হাঁয়ের মধ্যে। সাপের ব্যাঙ গেলার ভঙ্গিতে চার হাত পায়ে উপুড় হয়ে বসে আছে বউটা - মুখের হাঁ টা বড় জোঁকের মত মায়ের গোটা মাথাটাকে আঁকড়ে ধরেছে। গোটা শরীরটা তিরতিরিয়ে কাঁপছে আর আওয়াজ হচ্চে সলাৎ সলাৎ সলাৎ সলাৎ।
বিশুর গা গুলিয়ে উঠল, হড়াৎ করে বমি করে ফেলল। খালি পেটের পিত্ত জল বেরিয়ে এলো চোয়াল গড়িয়ে। বউটা চকিতে চোখ তুলল। মায়ের মাথাটা ছেড়ে দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে উঠে দাঁড়াল। প্রচন্ড ভয়ে বিশু ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল। হিলহিলে জোঁকের মতই সে এগিয়ে এল বিশুর দিকে। চাঁদের আলোয় বিশু দেখল দুটো জ্বলজ্বলে দুটো গোল গোল চোখ। সেই চোখের গোটাটাই উজ্জ্বল কালো। আর চোখের নীচে একটা কালো হাঁ। হাঁড়ির মুখের মত বড় নিটোল গোল একটা হাঁ! কি এটা! এটা কি! অন্ধকার জঙ্গলের নির্জনতা ভেঙে সীমাহীন আতঙ্কে গলা চিরে চেঁচিয়ে উঠল বিশু।
ভোজবাজির মত যেন মাটি ফুঁড়ে কোত্থেকে উদয় হল একটা ঢ্যাঙা লোক। বিশু আর সেই ভয়ঙ্কর জিনিসটার মাঝে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ডান হাতে ত্রিশূল উঁচিয়ে হুঙ্কার ছাড়ল, "এইইইই থাম!"
গুটিয়ে গিয়ে হাঁ বন্ধ করে কয়েকপা পিছিয়ে গেল জিনিসটা - জ্বলজ্বলে চোখদুটো কুঁচকে চাপা গর্জন করে উঠল। এরম আওয়াজ বিশু কক্ষণো শোনেনি। আতঙ্কে সারা শরীর অবশ হয়ে এল বিশুর।
"খবদ্দারররর! সালা নোংরা কীট.... এক পাও এগুবি না... তিরশূল গেঁতে দোবো...."
ভীষণ রাগে মুখের বিকট হাঁ টা বড় করে আরো একবার এগিয়ে এলো সেইটা - বিশে দেখল থালার মত বড় গোল হাঁয়ের গোটাটা ঘিরের করাতের মত দাঁতের সারি।
বাঘছাল পরা লোকটা "তবে রে নর্ রকের কীট! মর সালা...." বলে বাঁ হাতের মুঠো থেকে কিছু ছুঁড়ে দিল হাঁ করা মুখের দিকে।
রক্ত জল করা একটা চিৎকার ছেড়ে মাটিতে ছিটকে পড়ে ছটকাতে লাগল সেই দানবিক মূর্তি। লোকটা বাঁ হাতের মুঠোয় আবার কি নিয়ে ছোঁড়ার উপক্রম করতেই সড়সড় করে চোখের নিমেষে এঁদো ডোবায় নেমে পানা জল তোলপাড় করে ওপারে গিয়ে উঠল। অন্ধকারে আধা অজ্ঞান বিশু শুনতে পেল গাছপালা ভেঙে কি যেন খুব জোরে ছুটে পালাচ্ছে। নিজের ছোট্ট শরীরটাকে মায়ের নিথর দেহটার ওপর ছুঁড়ে দিয়ে বিশ্বনাথ দেখল মা আর নড়ছে না। চাঁদের ফ্যাসফ্যাসে মড়া আলোয় দেখা গেল মায়ের মাথার দিকটা আর চেনা যাচ্ছে না।
জ্ঞান হারানোর আগে বিশে আবছা শুনতে পেল, "এই ব্যাটা.... চল এখেন থেকে... চল বলচি.." হাতে একটা শক্ত হ্যাঁচকা টান।
সজনে ডাঁটার ছিবড়ে বিশু দেখেছে।
মায়ের মাথাটা..... বিশুর দুচোখে বিলের গভীর জলের মত অন্ধকার নেমে এল।
******
ট্রেন ছুটছে কলকাতার দিকে। পন্ডিত মশাইয়ের কাছে বিশু শুনেছিল কলকাতা নাকি খুব বড় শহর। বিশু কখনো শহর দেখেনি।
জানলার ধারে বসা বিশুর চোখের জল শুকিয়ে গালে খরখরে মরা পড়ে গেছে। কামরা ফাঁকা। বাইরের গাছগুলো কেমন হু হু করে পেছন দিকে ছুটছে। জ্ঞান ফেরার পর দুদিন ধরে বিশু পাগলের মত কেঁদেছে। কান্না আর আসছে না। বুকে চাপা একটা বোবা কষ্ট। ক্লান্ত চোখে শিবঠাকুরের দিকে তাকাল সে। মুনষির হাটের শিবঠাকুর ট্রেনের সিটে ঠ্যাঙ তুলে বসে আরাম করে বিড়ি টানছে। গায়ের কটকটে নীল রঙ জায়গায় জায়গায় উঠে তামাটে চামড়া দেখা যাচ্ছে। বিশু চাইতে ভুরু নাচিয়ে বলে উঠল, "কিরে? টেরেনে চড়েচিস কখ্নো?"
দুর্বল গলায় বিশু বলল, "ওটা কি ছিল?"
গম্ভীর হয়ে ঠাকুর বলল, "ওসব জিনিসের নাম নেই।থাকলেও নিতে নেই। ওরম অনেক শয়তানের বাচ্চাদের ভব বোরূপী শায়েস্তা করেচে।"
ট্যাঁক থেকে ময়লা লাল কাপড়ে মোড়া শক্ত লম্বামত কি একটা বার করে বিশুর হাতে গুঁজে দিয়ে বললে, "এটে কাছ ছাড়া করবিনে ককনো।"
বিশু খুলে দেখে কিসের একটা দাঁত। হলদেটে, কুকুরের দাঁতের মত কিন্তু অনেক বড় আর হাতের চেটোর মতন লম্বা।
"এটা কিসের দাঁত ঠাকুর?"
- "আহ্! তোর অত জেনে কি দরকার? ছোঁড়াটার না সবেতে কি আর কি.... এ যে জিনিসের দাঁত তার নাম তুই কেন তোর চোদ্দপুরুষে কেউ কখনো শোনেনি। যা বলছি কর।" খিঁচিয়ে ওঠে ভব বোরূপী।
"আর শোন তোকে যেখানে নে যাচ্চি সেটা ভদ্দলোকের বাড়ি। অনেক বড় জমিদারবাড়ি। শালারা বামুন। বড়কত্তা খুব ভালো লোক কিন্তু বাগদীর পো শুনলেই তায়ড়ে দেবে। তাই তুই বলবি তোর নাম বিশু সরকার। হ্যাঁ? বাপ মা পটল তুলেচে আর তিনকুলে কেউ নেই।"
শ্রান্তভাবে ঘাড় নাড়ে বিশু।
ভব শুধোয় আবার, "কি নাম বলবি? গোটা নাম বল।"
- "বিশু সরকার.... বিশ্বনাথ সরকার।"
******
"সরকার বাবু?" পেছন থেকে এসে আস্তে করে ডাকে রাম সিং। "বাড়ি যাবেন না বাবু? দিদিমণি হয়তো এসে গেছে।"
ধুতির খুঁটে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালেন বিশু সরকার - শ্যামা বাগদীর ছেলে। বাষট্টি বছর কেটে গেল কলকাতায়। তাও সেদিনের রাতের কথাটা আজও ভুলতে পারেননি।
পুজোর সময়টা এলেই মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ে আজকাল। আহিরীটোলার গঙ্গার ঘাটে সন্ধের হালকা ঝিরঝিরে বাতাস যেন বয়ে আনে মেটে আলু সেদ্ধ আর কাদাচিঙড়ির চচ্চড়ির গন্ধ।
"হ্যাঁ চল। দিদিমণিটা আবার অন্ধকারে ভয় পাবে। সুখেকে তো চিনি। সে হতভাগা নির্ঘাত আলো জ্বালতে ভুলেছে।"
******
"হুঁ। তা তোমাদের ওই হিলতোলা জুতো পরলে ঠ্যাঙ তো মচকাবেই মা।"
কড়িকাঠে একটা টিকটিকি ডেকে ওঠে।
একতলায় বাবা মায়ের ঘরে বিছানায় শোয়া মেয়েটা প্রতিবাদ করে ওঠে, "নাগো দাদু, বেচারা রাসমণি অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিল না? দেখে আমি এমন ভয়ে পেয়ে গেছিলাম.... হিহিহিহি...."
পায়ের গোছ ফুলে ঢোল। দোতলায় ওঠার থেকে এখানেই থাকা ভালো। বাবা-মা ও তো নেই। সুখিয়া ল্যাপিটা ওপরের ঘর থেকে এনে দিয়েই রান্নাঘরে ছুটেছে চুন হলুদ গরম করতে।
"বুঝলাম। তা তুমি তাহলে ঠাকুর দেখবে কি করে মা?"
"রিল্যাক্স দাদু, ঠিক হয়ে যাবে। চাপ নিও না। চিল।"
- "চিল শকুন বাদ দাও। রাসমণিটা আবার কে?"
- "সুখিয়া নিয়ে এসেছে। মা একজন মেয়ে খুঁজছিল না? ঘরের কাজ করার জন্য... খুব দু:খী মেয়ে দাদু। ওই তো রাসমণি চা এনেছে.... এসো এসো।"
রঙিন কাচের আর্চ মাথায় করে দাঁড়িয়ে বিরাট দরজা। তার ভারী পর্দা সরিয়ে চায়ের ট্রে হাতে ঘোমটা মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে রাসমণি।
খাটের পাশের টেবিলে ট্রে নামিয়ে ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়াল সে।
"চা নাও দাদু। উমমমম! দারুণ করেছ তো রাসমণি।"
সরকারমশাই চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে "আহ্!" বলে একটা তৃপ্তির আওয়াজ ছেড়ে বললেন, "ঘোমটা টা নামাতে পারো। আজকাল আর এসব কে করে? যাকে তাকে তো রাখতে পারি না। দেখি.... "
ফুলকাটা চায়ের কাপে দ্বিতীয় চুমুকটা দিলেন সরকার।
রাসমণি ঘোমটা নামিয়ে দাঁড়িয়েছে। টকটকে লাল চোঙার মত ঠোঁটটা জিভ দিয়ে চেটে নিল একবার। মাথা তুলে তাকালেন বিশ্বনাথ সরকার।
এই চোখ বিশু দেখেছে।
হাত থেকে চায়ের পেয়ালাটা সশব্দে মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। (চলবে)
[লেখাটা যখন শুরু করি তখন বলেছিলাম অনেক পুরোনো একটা ভূতের গল্পকে রিক্রিয়েট করবো। বলেছিলাম দেখি কে নাম গেস করতে পারে। অনেকেই সঠিক আন্দাজ করেছেন। যেখান থেকে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি সেই গল্পটির নাম 'রাসমণির গল্প'। বাণী রায়ের লেখা। তবে আমি ডিসাইড করেছি খোলনলচে পালটে ফেলার। 'রাসমণি' নামটা আর প্রোটাগনিস্ট মেয়েটিকে ধার নিয়েছি মাত্র। তিনটে পর্বেই বাকি ৯৫% সম্পূর্ণ বদলেছি। দেখা যাক কিরম লাগে।] - নির্বাণ

Wednesday, 4 October 2017

তৃষ্ণা (দ্বিতীয় পর্ব)

তৃষ্ণা (দ্বিতীয় পর্ব) - নির্বাণ
(প্রথম পর্ব পড়ার জন্য ক্লিক করুন)

[আলো নিভিয়ে পড়লে ভালো লাগবে]

সবেমাত্র লুচিটা ছিঁড়ে আলু ছেঁচকি দিয়ে মুখে পুড়েছি,  বাবা মুখ চুন করে ঘরে এসে ঢুকল। 
বাবার মুখ দেখেই মা বলে উঠল, "কিগো? মুখচোখ অমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে কেন?"
বাবা ধীরে ধীরে বলল, "আজ ভোরে সুশান্তর একটা অ্যাটাক হয়ে গেছে। মুনমুন ফোন করেছিল। এখন নার্সিংহোমে ভর্তি। অবস্থা ক্রিটিকাল।"
"সে কী!" মা আর আমি একসাথে চমকে উঠলাম।
"হুম, মুনমুন বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছে। একা মেয়েমানুষ বাচ্ছা ছেলেটাকে নিয়ে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। আর ওদের তো সেরম আত্মীয় স্বজনও কেউ নেই। আমি ছাড়া সুশান্তর তো আর কেউ...." বলতে বলতে গলা বুজে এল বাবার। চেয়ারে বসে পড়ল বাবা।
বাবার মন বুঝে নিয়ে মা হাঁক দিল, "কাকাবাবু, একবার শুনবেন?"
বাইরের দালানে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল সরকার দাদু। দাদু ঘরে আসতেই মা বলল, "আপনি রামকে এক্ষুনি একটা ট্যাক্সি ডাকতে বলুন। সুশান্ত নার্সিংহোমে ভর্তি। আমরা তিনজন ওখানেই রওনা দেবো। বেচারা বউটার কাছে গিয়ে না থাকলে কি করবে...."
আমি বলে উঠলাম, "ট্যাক্সি ডাকার দরকার নেই। আমিই ওলা ডেকে নিচ্ছি ফোনে। তোমরা দুজন রেডি হয়ে বড় রাস্তার দিকে চলো।"
- "তোমরা দুজন মানে? তুই যাবি না?"
- "পুজোর সময় আমি কলকাতা ছেড়ে নড়ছি না। বাবা নার্সিংহোম সামলাবে, তুমি ওদের ঘর সামলাবে। আমি গিয়ে লাভ হবে কি কিছু? তোমরা যাও। আমি বাড়ি সামলাবো। সরকার দাদু, রাম সিং আর সুখিয়া তো আছেই।"
বাবা কিছুক্ষণ স্থিরভাবে আমার দিকে চেয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মা কে বলল, "বাদ দাও। আমি একাই যাচ্ছি। দরকার নেই কারোর আসার।"

******

শেষ অবধি আমার কথাই রইল। বাবা আর মা কে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে প্যান্ডেলের দিকে চললাম। খারাপ লাগছিল। নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছিল। সুশান্তকাকু বাবার ছোটবেলার বন্ধু। প্রিয় বন্ধু যাকে বলে। আমার বাবার মতই সুশান্তকাকুও হাইস্কুলের টিচার - কাকুর পোস্টিং মেদিনীপুরে। বাবা ইতিহাস পড়ায় আর কাকু পড়ায় কেমিস্ট্রি। ছোটবেলা থেকেই গলায় গলায় দুজনের ভাব। পুজোর সময় কলকাতায় আমাদের বাড়িতে এসেই থাকে কাকু, কাকিমা আর ওদের ছেলে বিট্টু। বিট্টু এখন পড়ে ক্লাস সেভেনে।
কিন্তু নিজের মনকে কিছুতেই মানাতে পারলাম না। কলেজে উঠে এটা আমার প্রথম পুজো। কত্ত প্ল্যান হয়ে আছে বন্ধুদের সাথে।
প্যান্ডেলে গিয়ে ঠাকুরের কাছে ক্ষমা চেয়ে সুশান্তকাকুর সুস্থতা কামনা করে এলাম। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ঢুকে বুক ভরে একটা শ্বাস নিলাম। আমি স্বাধীন। গোটা বাড়িতে আমি একা। খুব সম্ভবত গোটা পুজোটাই একা। বাকিরা যদিও আছে তাও আমিই মালকিন বলে কথা। 
হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে সুদেষ্ণার মেজেস: 'পাক্কা সাড়ে এগারো কিন্তু। দেরী করবি না।'
এ বাবা! এগারোটা বাজতে পাঁচ! ঘড়ির দিকে খেয়ালই ছিলো না। তাড়াতাড়ি চান করতে দৌড়লাম।

******
ওলা ক্যাবটা যখন গলির মুখে নামিয়ে দিয়ে গেল তখন সন্ধে হব হব করছে। পাড়ার প্যান্ডেলের দিকে পা বাড়িয়েও থেমে গেলাম। আমাদের গলিতেই ঢুকলাম। সরু রাস্তায় একটা বাঁক নিতেই ঢাকের শব্দ যেন অনেকটা দূরে চলে গেল। দুধারে বিশাল বিশাল সাবেকি আমলের বাড়িগুলোর নোনাধরা দেওয়ালের মাঝখান দিয়ে গলিপথটা সাপের মত এঁকেবেঁকে এগিয়েছে। ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসা ঢাকের শব্দ যেন থমথমে নিস্তব্ধতাকে আরো ভারী করে তুলেছে। পোস্টে জ্বলে ওঠা হলদে ফ্যাকাশে বালবগুলোর দিকে তাকিয়ে গতকাল রাতের স্বপ্নের কথা আবার মনে পড়ে গেল। অন্ধকারটা যেন আরো একটু ঘন হয়ে এল। গাটা কেমন যেন শিরশিরিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে পা চালালাম।
সদর দরজাটা হাত দিয়ে ঠেলতেই ক্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল। অনেকদিন কব্জাগুলোতে তেল দেওয়া হয়নি। ভেতরে অন্ধকার। আমার পায়ে হাই হিল, ঢোকাটা রিস্কের। বিশাল বড় বড় থামগুলো আলো আঁধারিতে বহু বছরের ইতিহাসকে বুকে আঁকড়ে গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পরিত্যক্ত নাটমন্দিরটার ভেতর যেন শতাব্দীর অন্ধকার বাসা বেঁধেছে। ঝিঁঝিঁগুলোও যেন ডাকতে ভুলে গেছে। আমার গা ছমছম করে উঠল - নিজের বাড়িতে এই প্রথমবারের জন্য এরম অনুভূতি আমার হল। কেউ আলো জ্বালায়নি কেন?
বাড়িতে কি কেউ নেই? তাহলে সদর দরজায় তালা দেওয়া নেই কেন?

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। ফ্ল্যাশলাইট জ্বালারও উপায় নেই। ফোনটা সুইচ অফ। কালকে রাত্রে চার্জ দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ আবার সারাদিন নেট চলেছে।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। "সুখিয়া, সুখিয়া"।
হাঁক দিলাম। কোনো সাড়া নেই। "দাদু? ও দাদু.."
হঠাৎ দোতলায় কার্নিশ থেকে ফড়ফড় করে ডানা ঝাপটে কি একটা যেন মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। চমকে উঠলাম। প্যাঁচা হবে হয়তো। কালকে রাত্রের স্বপ্নটার কথা বার বার মনে হতে লাগল। জানলা আঁকড়ে অস্বাভাবিক ভাবে বসে ওটা কি ছিল? এত্ত আসল! সত্যি স্বপ্ন তো?
অনুভব করলাম হাতের আর পায়ের চেটোগুলো আবার ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে।
"স-সুখিয়া, দ-দাদু?"
আমার গলা কি একটু কেঁপে গেল?
কি আবোলতাবোল চিন্তা করছি! ধুর! নিজের বাড়িতে ভয় কিসের? দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেলাম দালানের দিকে। সিঁড়ির পাশেই সুইচবোর্ড। আলো জ্বলছে না, জ্বালিয়ে নেবো, ব্যাস। অত ভাবনা চিন্তার কি আছে?
দালানে উঠে সুইচবোর্ডের দিকে এগোতে যাচ্ছিলাম - অন্ধকারে আমার পায়ে লেগে নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে বিকট শব্দ করে কটা বাসন ছিটকে গেল। ঠিক সেই মূহুর্তে গলির দিক থেকে সমস্বরে কয়েকটা কুকুর কেঁদে উঠল।
প্রচন্ড চমকে গিয়ে সামনে তাকাতেই স্থির হয়ে গেলাম। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির পাশে আবছা সাদাটে একটা মূর্তি। মানুষের অবয়বই বটে। অন্ধকারে মনে হচ্ছে যেন শাড়ি পরে কোন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে।
- "ক-কে ওখানে? কে দাঁড়িয়ে আছে?"
চেঁচিয়ে বলতে গেলাম কিন্তু শুকনো গলা দিয়ে ফ্যাসফ্যাসে জড়ানো কিছু শব্দ বেরোল।
মূর্তিটা ধীরে ধীরে অদ্ভুত চালে আমার দিকে এগোতে শুরু করল। শরীরটাকে দুপাশে হেলিয়ে হেলিয়ে নি:সাড়ে এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে।  আমি আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পেছতে লাগলাম। অন্ধকারে ততক্ষণে একটু একটু চোখ সয়ে এসেছে। বুঝতে পারলাম একটা নারীমূর্তি, মাথায় ঘোমটা। হিলহিলে সাপের মত যেন তার চলন।
নিজেকে সাহসী বলে আমার যে ধারণাটা ছিল সেটা যে কতবড় ভুল তার প্রমাণ আমি নিজেই দিয়ে দিলাম। পেছন ফিরে ছুটতে গিয়ে পা মচকে ধরাশায়ী হলাম। প্রচন্ড যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলাম। ঠিক সেই সময় যেন ম্যাজিকের মত দালানের আলো জ্বলে উঠল।
******

"দিদিমণি কি হল? পড়ে গেলে কি করে?" ব্যস্ত হয়ে ছুটে এল সুখিয়া। যন্ত্রণায়, রাগে, ভয়ে তখন আমার চোখে জল এসে গেছে। 
- "কোথায় ছিলে তুমি? আলো জ্বালনি কেন?" চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
আমাকে হাত ধরে তুলতে তুলতে কাঁচুমাচুভাবে সুখিয়া বলল, "আমি পেছনের উঠোনে ছিলুম। বাসন মাজছিলুম। এই সবে আলো জ্বালতে এলুম।"
- "দাদু কই? আর রাম সিং?"
- "সরকারবাবু বাজারে গেছেন রাম সিংকে নিয়ে। আমি কি করে জানব তুমি এত তাড়াতাড়ি...."
আমার মুখের দিকে চোখ পড়তে থেমে গেল সুখিয়া।
আমার সামনে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে আধখানা ঘোমটা দিয়ে অত্যন্ত জড়সড় ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে একটা বউ। মেয়েদের তুলনায় বেশ অনেকটাই লম্বা, রোগাটে চেহারা।

আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির খেই ধরেই সুখিয়া বলল, "হেঁহেঁ, দিদিমণি ভয় পেয়েচ বুজি? ভয়ের কিছু নেই। ওকে আমিই এখানে দাঁড়াতে বলেছিলুম। মা ঠাকরুন আমাকে বলে গেসলো এই কদিনের জন্য একটা মেয়েছেলে কাজের লোক জোগাড় করতে। তুমি ছেলেমানুষ। বাড়িতে কোন মেয়েলোক না থাগলে ঠিক যত্ন আত্তি পাবে না। হেঁহেঁ, দিদিমণি ভয়ে পেয়েচে। দেখি দেখি পায়ে লাগল কি না...."
আমি লজ্জা পেয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বললাম, "তা এনাকে তুমি পেলে কোত্থেকে?"

- "ওই যো ঘাটের ধারে উপেনের দোকানে পান কিনতে যাই না? সেখেনেই মেয়েটার সাথে আলাপ। অনেকদিন ধরেই দেকচি - আসে, পান খায়। কারো সাতে পাঁচে নেই। তা আজ বিকেলে দেখি গিয়ে সে গঙ্গার ঘাটে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদচে। বলে কি না আগের বাড়ির বাবুরা মেরে তাড়িয়ে দেচে।"
ঘোমটার ভেতর বউটা ফুঁপিয়ে উঠল।
সুখিয়া বলে চলল, "তিনকুলে নাকি কেউ নেই। দেখে বড় মায়া হল। নিয়ে এলুম সাতে করে। মা ঠাকরুণও খুঁজছিলেন একজন মেয়েলো.... এই ঘোমটাটা সরা না। দিদিমণিকে মুকটা দেকা।"

বউটি ফ্যাটফ্যাটে সাদা শিরা ওঠা দুটো রোগা লম্বা লম্বা হাত দিয়ে ঘোমটাটা সরাতে মুখটা দেখতে পেলাম। অবাক হলাম।
এরম লম্বাটে মুখ আগে কারো দেখিনি। চিবুকের কাছটা সরু হয়ে অনেকটা নেমে এসেছে। খাড়া টিকালো নাকের দুপাশে দুটো গোলগোল জ্বলজ্বলে চোখ, অদ্ভুত ঠান্ডা দৃষ্টি - চোখ দিয়ে যেন শরীরের অনেক ভেতর অবধি উঁকি মারে। গালদুটো অনেকটা করে ঢোকা। গায়ের রঙ ফ্যাটফ্যাটে সাদা - অস্বাভাবিক সাদা।
আর মহিলার মুখের মধ্যে সব থেকে আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য যেটা চোখে পড়ল সেটা হল তার ঠোঁট।
ঠোঁটদুটো যেন গোল হয়ে লম্বাটে চোঙার মত আকৃতি সৃষ্টি করেছে আর মুখ ফ্যাকাশে সাদা হলে কি হবে ঠোঁটজোড়ার রঙ লাল - টকটকে লাল।

জিজ্ঞেস করলাম, "নাম কি তোমার?"
রক্তিম ঠোঁটজোড়া নড়ে উঠলো। খসখসে ঠান্ডা গলায় জবাব এলো, "আমার নাম রাসমণি।" (ক্রমশ)

[কদিন আগে একটা ব্লগে অনেক পুরনো কিছু ভূতের গল্পের সন্ধান পেয়েছি। ছোটবেলায় পড়া। আমার তো মনে হয় আমাদের দাদু দিদাদেরও ছোটবেলাকার - এত্ত পুরনো। তার মধ্যে থেকেই একটা গল্পের প্লটকে নতুনভাবে রিক্রিয়েট করার চেষ্টা করছি। টানা অনেক বড় পোস্ট দিলে পাঠকরা বোর হতে পারেন ভেবে কয়েকটা অংশে দেবো। কেমন লাগল জানাবেন। শেষে আসল গল্পের নামটা জানিয়ে দেবো। তার মধ্যে দেখি কে গেস করতে পারে।]

Monday, 2 October 2017

।।তৃষ্ণা।।

।।তৃষ্ণা।। নির্বাণ


(ঘরের আলো নিভিয়ে পড়ার অনুরোধ রইল।)                                                                      ছবি: ইন্টারনেট। 

আমাদের বাড়িটা শহরের একপ্রান্তে। দুর্গাপুজোর ছোঁয়া বাড়ি অবধি এসে পৌঁছয় না। পুরনো কলকাতার আলো আঁধারি গলিঘুঁজির গোলকধাঁধায় চলতে চলতে হঠাৎই এসে ঠোক্কর খেতে হয় আমাদের সিংহদুয়ারে। স্যাঁতস্যাঁতে শ্যাওলাধরা বাড়িগুলো নিজেদের মধ্যে এত ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে যে পারলে সূর্যের আলোটাও শুষে নেয়। রাস্তার দুধারে কাঁচা ড্রেন থেকে দুর্গন্ধ ওঠে। বিকেল হতেই শুরু হয়ে যায় মশাদের ঘ্যানঘ্যানানি। গলিপথ দিয়ে মিনিট দেড়েক হাঁটলেই অবশ্য চওড়া রাস্তায় এসে পড়া যায়। খুব বড় না হলেও একটা পুজো সেখানে হয়। মধ্যবিত্ত বাঙালি পাড়ার প্রায় উঠে যেতে বসা একটা ক্লাব, সাধারণ লাল কাপড়ের প্যান্ডেল, পাড়ারই কচিকাঁচা, ছেলেপুলে, মেয়েবউদের খানিক জমায়েত। তবে আলোর ব্যাপারে কার্পণ্য করে না এ পাড়ার লোকজন। পুরনো বাড়িগুলোয় ছাদ থেকে পর পর ঝোলানো হয় হলদে চেন লাইট। এছাড়া পোস্টে পোস্টে চন্দননগরের লাল নীল নকশাদার নিওন আলো। খুব বেশী জায়গা জুড়ে না হলেও খুব সুন্দর করে সাজানো হয় পাড়াটাকে। হয়তো সারাবছর আমাদের পাড়াটায় আলোর খুব অভাব বলেই সবার একটা বাড়তি তাগিদ থাকে এই পাঁচটা দিন আলোর শেষ বিন্দুটুকুও তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে নেওয়ার।

এবারেও পঞ্চমীর রাতে ভ্যান রিক্সায় চাপিয়ে কুমোরটুলি থেকে হইহই করে ঠাকুর আনা হল। পাড়ার বউরা শাঁখ বাজাল - কাঁসরঘণ্টার ঠ্যাংঠ্যাঠ্যাং ঠ্যাং আওয়াজ। একচালা ঠাকুর। মায়ের মুখটা ভারী মিষ্টি।

সেদিনই আমার কলেজে ছুটি পড়েছিল। সন্ধের দিকে আমাদের সরু গলির মুখে দাঁড়িয়ে আমি, মা, সরকার দাদু, আর আমাদের দারোয়ান রাম সিং ঠাকুর আনা দেখেছিলাম। আমাদের উপস্থিতি কিছুটা প্যাসিভ। হইচইতে আমরা সামিল হই না। একসময় হুগলি জেলার বিখ্যাত জমিদার ছিলেন আমার বাবার দাদুরা। তাদেরই তৈরি এই বাড়ি। বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলাই ভালো। যদিও বেশীরভাগ অংশ এখন ভগ্নপ্রায়, জঙ্গুলে, তালাবন্ধ। জীবিত প্রাণী বলতে আমি, বাবা, মা, আমাদের সরকার দাদু, দারোয়ান রাম সিং আর কুক কাম কেয়ারটেকার সুখিয়া।
এরা তিনজনেই ষাটোর্ধ। আমার দাদুর আমল থেকে বাড়িতেই আছে। শুধু বাবাই নয়, আমিও এদেরই কোলেপিঠে মানুষ। সেদিন দূর থেকেই নমস্কার সেরে বাড়ি ফিরেছিলাম আমরা। টর্চ জ্বালিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল রাম সিং। আমাদের গলিপথে পাশাপাশি দুজন হেঁটে চলাও ভারী মুশকিল। মাঝে মাঝে এই ভেবে অবাক হই যে কিভাবে এই এঁদো গলির মধ্যে এত বিশাল বাড়ি খাড়া করা হয়েছিল।

আমাদের সরু অন্ধকার গলিতে সন্ধে থেকে পঞ্চাশ গজ অন্তর আলো জ্বলে। ষাট পাওয়ারের হলদেটে বাল্ব - অন্ধকারে মনে হয় যেন একচোখওয়ালা কোনো লম্বা দানব তার ঘোলাটে চোখে নিষ্পলকে তাকিয়ে আছে। তাতে অন্ধকার বাড়ে বই কমে না।

দোতলায় আমার পড়ার ঘরের ঠিক পাশেই ওরকমই একটা ল্যাম্পপোস্ট আছে। বড়বড় গরাদ দেওয়া জানলা দিয়ে পর্দা ভেদ করে আবছা আলো এসে ঘরের মেঝেতে নানারকম আঁকিবুঁকি কাটে। আরেকটা জানলার পাশেই আমার পড়ার টেবিল। জানলার ঠিক গা ঘেঁষেই একটা শিউলি ফুলের গাছ। শরৎকালে গন্ধে ঘর ম ম করে। কিছুদূরে সোজা গঙ্গার ঘাট চোখে পড়ে। 
কলেজ খুললেই টেস্ট। খুব ভালোভাবেই জানি যে আগামী পাঁচদিন বই ছুঁয়েও দেখা হবে না। আর আমাদের গার্লস কলেজে খুব কড়াকড়ি - কলেজ না বলে স্কুলই বলা ভালো। টেস্টে অ্যালাও না হতে পারলে সে বছর কোনভাবেই ফাইনালে বসতে দেওয়া হয় না।
 রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর এগারোটা নাগাদ তাই বই নিয়ে বসেছিলাম। কলকাতা শহরে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে হলে ইউ আর অলওয়েস ওয়েলকাল টু আওয়ার নেইবরহুড।
জানলা দিয়ে হালকা হাওয়ায় শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। দূরে গঙ্গার ঘাটে ছোট্ট ছোট্ট আলোর বিন্দুর আনাগোনা দেখতে দেখতে কেমন যেন ঘোর লেগে গিয়েছিল। জানি না কতক্ষণ একভাবেই বসেছিলাম।
হঠাৎ পায়ে ভিজে ছোঁয়া পেয়ে চমকে উঠলাম।
ঘর অন্ধকার। টেবিলে শুধু আমার স্টাডিল্যাম্পটা জ্বলছে। ভীষণ চমকে অনুভব করলাম আমার গোড়ালি অবধি জলে ডুবে গেছে! বৃষ্টি হলে একতলায় জল ঢোকে, কিন্তু আমি তো দোতলায়!  সভয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। জল হু হু করে বাড়ছে।
জল এখন আমার হাঁটু অবধি - ইষৎ গরম আর ভারী। ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম যে কয়েক মূহুর্ত কিছু ভাবতেও পারিনি। আলো জ্বালানোর জন্য পিছন ফিরতেই চোখ পড়ল মেঝের দিকে, কিন্তু মেঝে তো আর দৃশ্যমান নয়। জানলা দিয়ে আসা আবছা আলোর আলপনা চিকমিক করছে যে তরলটার ওপর সেটার রঙ লাল, গাঢ় লাল! আর অদ্ভুত একটা নোনতা পরিচিত গন্ধে ঘর যেন ভরে গেছে - রক্ত!
হে ভগবান! রক্ত!

ঘর ভর্তি রক্ত ততক্ষণে আমার কোমর ছাড়িয়েছে। আমি পাগলের মত ছপছপিয়ে পা টেনে এগোতে গেলাম বন্ধ দরজার দিকে। পারলাম না। পায়ে জড়িয়ে পড়ে গেলাম। আমার জামাকাপড়, মুখ, মাথা নোনতা লালে সম্পূর্ণ সিক্ত। এত রক্ত আসছে কোত্থেকে! মাথা কাজ করছে না। আমার বুক ছাড়িয়ে চিবুকে রক্তের ছোঁয়া লেগেছে।
চিৎকার করে মা কে ডাকতে গেলাম। হাঁ করতেই মুখ দিয়ে হুড়মুড় করে রক্ত ঢুকে এল। বিকট গন্ধে আর স্বাদে বমি পেয়ে গেল। আমার পা ততক্ষণে আর মাটিতে নেই। রক্তের পুকুর আমার মাথা ছাড়িয়েছে। আমি ভাসছি, আবার ডুবছি। আমি সাঁতার জানি না - সরকার দাদু অনেক চেষ্টাতেও শেখাতে পারেনি।

কড়িকাঠটা এখন নাগালের মধ্যে। ভীষণ ঝড়ের মাঝে মানুষ খড়কুটোকেও আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। সর্বশক্তি দিয়ে শরীরটাকে ছুঁড়ে দিয়ে হাত বড়িয়ে কড়িকাঠটা ধরার একটা মরিয়া চেষ্টা। ফস্কাতেই আমি ঝুপ করে ডুবে গেলাম অনেকটা। চারিদিকে তীব্র লাল অর্ধস্বচ্ছ তরলের মধ্যে আবছা দেখতে পেলাম আমার দিকে কেউ সাঁতরে এগিয়ে আসছে। অন্ধকার এক মূর্তি। তার চুলগুলো সাপের উদ্যত ফণার মত এলোপাথাড়ি রক্তের মাঝে খেলা করছে। আতঙ্কে ছটফটিয়ে উঠতেই আমার মুখ নাকের মধ্যে দিয়ে প্রচন্ড বেগে রক্তের তোড় দম বন্ধ করে দিতে লাগল। আমার ফুসফুস জ্বলে যেতে লাগল, বুকটা মনে হল ফেটে যাবে, চোখ বিস্ফোরিত, আমি মরে যাচ্ছি......

ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল ঘোর কাটতে। সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে জবজব করছে। বুকটা হাপরের মত ওঠানামা করছে। সামনের জানলা দিয়ে দূরে গঙ্গার ঘাটের দু চারটে মিটমিটে আলো দেখা যাচ্ছে। সামনে ফিজিক্সের বই খোলা। টেবিল ল্যাম্পটাও জ্বলছে। কোথায় রক্ত? মেঝেতে এক ফোঁটা জলও পড়ে নেই! কোনরকমে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। হাঁটুদুটো থরথর করে কাঁপছে। কোনমতে বিছানার কাছে এসে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে বালিশের ওপর রাখা ফোনটা তুলে নিয়ে লক বাটন প্রেস করলাম। রাত দুটো বেজে তেতাল্লিশ।
আ-আ-আমি স্বপ্ন দেখছিলাম! এতক্ষণ তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম! ভয়ে আমার হাত পা তখনও অসাড়। সেই বীভৎস রক্তের পুল যেন চোখের সামনে ভাসছে। রক্তের সেই জঘন্য নোংরা গন্ধ আর স্বাদ যেন আমার ইন্দ্রিয়গুলোকে এখনও বশীভূত করে রেখেছে। তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম! এত আসল!
মানে কি এই স্বপ্নের? আগে তো কখনও এরম স্বপ্ন দেখিনি!
গলা শুকিয়ে কাঠ। শরীরের কাঁপুনি ধীরে ধীরে থামছে। নার্ভগুলো থিতু হচ্ছে। ফোনটা বালিশের ওপরেই রেখে ক্লান্তভাবে এগিয়ে গেলাম গলির জানলার দিকে। জানলা থেকে জলের বোতলটা তুলে নিয়ে ছিপি খুলে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে জানলার দিকে তাকাতেই রক্ত জল হয়ে গেল।

চার হাতে পায়ে জানলার গরাদ ধরে অদ্ভুত বিকৃত ভঙ্গীতে আটকে আছে একটা মানুষ। না! মানুষ কি করে হয়! মানুষ কি পা দিয়ে কিছু ধরতে পারে!
হাত থেকে জলের বোতলটা মাটিতে পড়ে গেল। মূর্তিটার ঠিক পিছনে ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলো থাকায় মুখ দেখা যাচ্ছে না - শুধুমাত্র অন্ধকার একটা বিকৃত সিল্যুয়েট। মাথার চুলগুলো উদ্যতফণা সাপের মত হালকা বাতাসে উড়ছে। এ-এই জিনিসটা যাই হোক না কেন মানুষ হতে পারে না। আতঙ্কে আমার গলা বুজে এল। নড়তেও পারলাম না।
প্রস্তরবৎ আমাকে উদ্দেশ্য করেই হয়তো অদ্ভুত বিকৃত কন্ঠস্বরে হিসহিস করে দুর্বোধ্য কিছু একটা বলে উঠলো জিনিসটা। তারপরেই একটা বিকট কানফাটা অট্টহাসি। আমার মাথা ঘুরে গেল। 

চিৎকার করে উঠতেই দেখি বসে আছি আমার পড়ার টেবিলে। কপালে, ঘাড়ে, গলায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সামনের বইটা বন্ধ করা। জলের বোতলটা মেঝেতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। বোতল থেকে গড়ানো জল জমা হয়েছে ঘরের কোণে। আবার স্বপ্ন!
জানলার দিকে তাকিয়ে দেখি আকাশে সাদাটে ফ্যাকাশে ছোপ ধরেছে। পুবের আকাশ লাল। আড়ষ্ট হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলাম চেয়ারেই। পাশের বাগান থেকে কিচিমিচি ভেসে আসতে শুরু করার পর চেয়ার ছেড়ে উঠলাম। হাত আর পায়ের চেটো ঠান্ডা বরফ। বালিশের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে দেখি চারটে কুড়ি। ভোর হয়ে গেছে।

সারারাতটা তাহলে আমি চেয়ারে বসে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিয়েছি স্বপ্ন দেখে? কিন্তু স্বপ্ন কি এতটা জীবন্ত হয়? এমনিতে আমি খুব সাহসী মেয়ে। এই বিশাল আদ্যিকালের বাড়ির দোতলায় আমার স্টাডি রুম। ক্লাস সেভেন এইট থেকেই আমি একা শুয়ে অভ্যস্ত। তাও আজ আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। জীবনে এই প্রথম।
ধুর! সত্যি তো ভয় পাইনি। ওগুলো তো স্বপ্ন। ল্যাপটপে অত্যধিক হরর মুভি দেখে আমার উর্বর মস্তিষ্কের বিকৃত কল্পনা।
ভোরের আলো ততক্ষণে সামনের জানলা দিয়ে ঢুকে উল্টোদিকের দেওয়ালে সাদা একটা আয়তক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। হাসি পেল। স্বপ্ন দেখে এরম ভয় পেয়েছি জানলে বন্ধুরা খুব একচোট খিল্লি নেবে। পড়া তো ছাই কিছুই হল না রাত্তিরে, এখন কদিন হবেও না - আজ ষষ্ঠী। বইটই গুছিয়ে রেখে নীচে চললাম। তাও মনে একটা খটকা রয়েই গেল..... স্বপ্ন! এত্ত আসল! যাকগে.....

সেদিন সকালেই জলখাবার খেতে বসে একটা দু:সংবাদ পেলাম। - নির্বাণ রায়।  (Follow Nirban on Facebook)

(পরবর্তী অংশ আগামীকাল রাত পৌনে নটায়।)

[কদিন আগে একটা ব্লগে অনেক পুরনো কিছু ভূতের গল্পের সন্ধান পেয়েছি। ছোটবেলায় পড়া। আমার তো মনে হয় আমাদের দাদু দিদাদেরও ছোটবেলাকার - এত্ত পুরনো। তার মধ্যে থেকেই একটা গল্পের প্লটকে নতুনভাবে রিক্রিয়েট করার চেষ্টা করছি। টানা অনেক বড় পোস্ট দিলে পাঠকরা বোর হতে পারেন ভেবে কয়েকটা অংশে দেবো। কেমন লাগল জানাবেন। শেষে আসল গল্পের নামটা জানিয়ে দেবো। তার মধ্যে দেখি কে গেস করতে পারে।]

Saturday, 26 August 2017


কালপুরুষ ২
- নির্বাণ রায়,    ছবি: ওঙ্কার নাথ।  Read Kalpurush 1 Here.

মাথাটা দু'হাত দিয়ে চেপে ধরে কিছুক্ষণের জন্য বসে রইল প্রদোষ। ঘরটা মনে হচ্ছে যেন দুলছে। ফার্নিচারগুলো থরথরিয়ে কাঁপছে। কখনও মনে হচ্ছে যেন একটা জায়ান্ট বলের মধ্যে সে বসে আছে। আর বলটা মাঝেমধ্যেই প্রচন্ড গতিতে গড়াচ্ছে। পুরো জগতটা তালগোল পাকিয়ে ঘেঁটে যাচ্ছে।
আর কি বীভৎস চিৎকার! উফফফফ! দু'হাত দিয়ে সজোরে কান চেপে ধরলো প্রদোষ - অনেকগুলো গলা - ডাকছে, কোনোটা বাঁশির মত সুরেলা অথচ তীক্ষ্ণ হয়ে বাজছে, কোনোটা অদ্ভুত বীভৎসভাবে হাসছে, প্রচন্ড যন্ত্রণায় কেউ কাঁদছে.... আর থেকে থেকে.... থেকে থেকে কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে।
সমস্যাটা হল আওয়াজগুলো কোত্থেকে আসছে অনেক চেষ্টা করেও সে ঠাওর করতে পারছে না। টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো প্রদোষ - সিলিংটা মনে হচ্ছে মাথার কাছে নেমে এসেছে। দক্ষিণের জানলাটা বহু দূরে ছোট্ট হয়ে দেখা যাচ্ছে। আর মেঝেটা তো সবসময় কেঁপেই চলেছে। গোটা ঘরটা দুলছে।
প্রদোষের আবছা আবছা মনে পড়ছে সাদা পোশাক পরা একটা লোক - মগনলালের খাস বেয়ারা একটা ট্রেতে করে তিনটে কাচের গ্লাস এনে রাখল। বাদামের সরবত।
চুমুক দিল প্রদোষ। আহা! বুকটা যেন জুড়িয়ে গেল। বিষের ভয় সে করে না। এই মগনলাল সাক্ষাৎ শয়তানের শাগরেদ হতে পারে, কিন্তু বিষ.... উঁহুঁ।
- "আরে আঙ্কেলজী, খেয়ে নিন, খেয়ে নিন.... কেতোবার বলবো যে উ সরবতে ভিষ নাই... একটু তো বিসোয়াস করেন এবার হামাকে..... জহের খাওয়ানোর হলে তো কাশীতেই খাওয়াতে পারতাম..."
- "ইয়ে আজকে একটু গ্যাস অম্বল মত হয়েচে বুঝলেন? আজ আর ও জিনিস সহ্য হবে না।"
তারপর.... তারপর লালমোহনবাবুকে নিয়ে কিছু একটা মন্তব্য করলো প্রদোষ.... হ্যাঁ হ্যাঁ.... কি যেন বেশ? মনে পড়ছে না উফফফ!
তোপসে হেসে উঠলো.... মগনলাল হেসে উঠলো......
তোপসে? তোপসে! তোপসে কই? তোপসে!
কি ছিলো ওই সরবতে? কি খাওয়ালো মগনলাল?
উফফফফ! কি চিৎকার! মাথা যেন ছিঁড়ে পড়ছে... টিউবলাইটটা দপদপ করছে..... একবার জ্বলছে একবার নিভছে। আলো-আঁধারির এক অদ্ভুত খেলা। মাঝে মাঝে অন্ধকারে যেন টিউবলাইটটা বিদ্যুতের মত চমকাচ্ছে। কিন্তু স্থির হতে পারছে না।
স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না প্রদোষও। দেওয়াল ধরে ধরে এগোনোর চেষ্টা করলো। পায়ে কি যেন ঠেকলো! নিচের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো প্রদোষ!
উপুড় হয়ে পড়ে আছে দেহটা! মুন্ডহীন!
সমস্ত দেহ ঘামে ভিজে গেছে প্রদোষের। নিজেকে এতদিন সাহসীই ভেবে এসছে সে। মেঝেটা ভেসে যাচ্ছে রক্তে। টিউবলাইটের দপদপানিতে একবার কালো, আবার লাল, আবার কালো, তারপর লাল.....
একটু দূরে টিভির ওপর বসানো একটা গোলমত জিনিস। ওটা কি.... ওটা কি....!! কি নোংরা খেলা খেলছে এই মগনলাল!
উফ!.... সরবতটা! এরম জাজমেন্টের ভুল তার হলো!
পায়ে পায়ে টলতে টলতে এগিয়ে গেলো প্রদোষ। হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ নেই। জিনিসটা একটা মাথা! একটা মানুষের মাথা! কিন্তু কার? একটা অজানা আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠলো প্রদোষের।
টিউবলাইটের দপদপানিতে মুখটা বোঝা যাচ্ছে না ভালো করে দূর থেকে। ফুটখানেকের মধ্যে আসতেই ম্যাজিকের মত টিউবলাইটটা দপ করে জ্বলে উঠলো। কয়েক মূহুর্তের জন্য চোখে ধাঁধা লেগে গেলেও মুখটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো। ধারালো কিছু দিয়ে জঘন্যভাবে বিকৃত করা হলেও বোঝা যাচ্ছে মাথাটা কার। স্থির দুটো চোখ তাকিয়ে রয়েছে প্রদোষের দিকে।
টিভির স্ক্রিনটা ভাঙা। মাটিতে পড়ে রয়েছে ছুরির মত লম্বা লম্বা কাচের টুকরো - রক্তমাখা।
হে ভগবান! মগনলাল এতটা নৃশংস! বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো, নিজের গেস্ট হাউসে ছুটি কাটাতে ডাকা - এই সবই কি তাহলে একটা নিষ্ঠুর খেলা!
পেছনে পায়ের আওয়াজ পেয়ে চমকে ঘুরে দাঁড়ালো প্রদোষ। দরজা খুলে ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে জনা পাঁচেক লোক। সাদা পোশাক পরা তিনজন - এরা তো.... এরা তো মগনলালের বেয়ারা! সাথে সাহেবি পোশাক পরে আরো দু'জন। সামনের জন বেঁটেখাটো টাকমাথা। গম্ভীর মুখ, প্যান্টের পকেটে দুটো হাত।
- 'লালমোহনবাবু.... লালমোহনবাবু.... ক্-কারা যেন.... ক্-কারা যেন তোপসেকে.... ওই মগনলাল.. মগন...." বলতে গিয়ে গলা বুজে এলো প্রদোষের।
মাথা কাজ করছে না তার। বুকের ভেতর থেকে দলা পাকিয়ে উঠে আসছে কান্না। ঠান্ডা মাথা, স্টিলের মত নার্ভ - মগনলালের অট্টহাসি শুনতে পেলো প্রদোষ।
"কি মিস্টার মিত্তর? শক লাগলো?.... ফেলুদা ফেলুদা! বাঁচাও!...... তুমি শুধু ঘুঘুই দেখেছো মগনলাল.... আঁশ ছাড়ানো হচ্ছে কোতোয়ালিতে.... উটের পাকস্থলী.... আনুবিস হাসছে....."
সবকিছু ঘেঁটে যাচ্ছে... কোত্থেকে আসছে আওয়াজগুলো? কে? কে কথা বলছে?
- "লালমোহনবাবু? শুনুন..... শুনতে পাচ্ছেন? ওই যে হাসছে.... কারা যেন হাসছে। তো-তোপসেকে..... মেরে ফেলল!"
- "প্রদোষ। প্রদোষ, শান্ত হও।"
হিমশীতল গলায় বললেন লালমোহনবাবু।
- "শান্ত হব? কি বলছেন কি আপনি? আর এরা... এরা তো মগনলালের লোক। আপনি এদের সাথে কি করছেন? এরা মেরেছে তোপসেকে। কি করছেন আপনি এদের সাথে?" চিৎকার করে উঠলো প্রদোষ।
- "শান্ত হও প্রদোষ। এরা কেউ তপেশকে মারেনি। তুমি মেরেছ।"
- "ক্-কী যাতা বলছেন লালমোহনবাবু? আপনিও তাহলে মগনলালের সাথে মিলে....!!"
- "মগনলাল বলে কেউ নেই প্রদোষ। ইটস টাইম টু অ্যাক্সেপ্ট দ্য রিয়ালিটি।"
- "অত সহজে ফেলু মিত্তিরকে বোকা বানাতে তুমি পারবে না জটায়ু। তলে তলে মগনলালের সাথে ভিড়ে আমাকে.... হাহাহাহা! আমাকে.... নাহ্! তোমাদের হাতে আমি আসছি না। কিছুতেই না!"
- "কাচের টুকরোটা রেখে দাও প্রদোষ। উই আর ইয়ার টু হেল্প ইউ। প্রদোষ! কুইক! গ্র‍্যাব হিম!"
ডান হাতে ধরা কাচের ফালিটা নিয়ে নিজের বাঁ হাতের কব্জিতে চালাতেই সাদা পোশাক পরা তিনজন লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রদোষের ওপর। মেঝেতে ফেলে চেপে ধরে ঘাড়ের পাশে ইঞ্জেকশনের ছুঁচটা গুঁজে দিতেই ছটফটানি থেমে এলো প্রদোষের। ঘুমের একটা চাদর নেমে আসতে থাকল চোখের ওপর। আবছা আবছা দেখতে পেল সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মগনলাল। মুখে ক্রুর হাসি। বাঁ হাতের রিস্টটা তুলে দেখালো মগনলাল..... রক্ত ঝরছে.... ডান হাতে কাচের টুকরো.... অন্ধকার।
বিশাল একটা কাঠের টেবিল। দু'দিকে গদি আঁটা দুটো কাঠের চেয়ারে বসে আছেন দুই ভদ্রলোক। টেবিলে একটা কাচের গ্লাস - স্কচ, বরফ ভাসছে। আর একটা গ্লাস ধরা টাকমাথা ভদ্রলোকের হাতে। আবছা একটা আলো জ্বলছে।
"ব্যাপারটার সূত্রপাত কলকাতায়। তা প্রায় তিরিশ বছর তো হলই।"
হাতে ধরা গ্লাসে চুমুক দিয়ে শুরু করলেন টাকমাথা ভদ্রলোক।
"প্রদোষচন্দ্র মিত্র। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলো। কলকাতার একটা নি:সন্তান ফ্যামিলি ছেলেবেলায় অরফ্যানেজ থেকে অ্যাডপ্ট করেছিলো। নামটাও তাঁদেরই দেওয়া। ও অবশ্য কিছুই জানত না। ছেলেবেলা থেকেই প্রদোষকে শেখানো হয়েছিলো যে ওর বাবা-মা একটা এক্সিডেন্টে মারা যান আর ওঁনারা ওর কাকা-কাকিমা। পরবর্তীকালে তাঁদের একটা ছেলে হয় - তপেশরঞ্জন, নিকনেম তোপসে। তবে প্রদোষের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা কোনো অংশে কমেনি। ভাইকেও প্রদোষ খুব ভালোবাসত। ভাইও ফেলুদা বলতে অজ্ঞান।"
আরেক ভদ্রলোক ঘড়ি দেখলেন, "ব্রিফলি বলুন। ফ্লাইট রেডি হয়ে এলো বলে।"
- "তখন প্রদোষের পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়স। আনফরচুনেটলি একদিন তপেশ খুন হয়। খুব সম্ভবত হি উইটনেসড সামথিং হুইচ হি শুডন'ট হ্যাভ। মোস্ট প্রবাবলি আ ড্রাগ ডিল। সেই সময়কার কুখ্যাত ড্রাগ মাফিয়া মগনলাল মেঘরাজের নাম জড়ায়। কিন্তু মগনলাল পলিটিকাল ইন্সফ্লুয়েন্স খাটিয়ে বেঁচে যায়। ঘটনাটা কিন্তু প্রদোষ কিছুতে ভুলতে পারে না। সাইকোলজিক্যাল ড্যামেজ হওয়া তখন থেকেই শুরু। মে বি জেনেটিক প্রবলেমও কিছু ছিলো। কিন্তু আমরা অনেক চেষ্টা করেও ওর অরিজিনাল পেরেন্টসদের হিস্টরি ট্র‍্যাক করতে পারিনি।
একদিন রাত্রে প্রদোষ মগনলালের কলকাতার বাড়িতে লুকিয়ে ঢোকে। মগনলাল ছিলো কলকাতার বাইরে। পুলিশ পরেরদিন সকালে প্রদোষকে মগনলালের বাড়িতে আবিষ্কার করে। সাথে মগনলালের দুই ছেলে আর স্ত্রী - ব্রুটালি মার্ডারড। তারপর থেকে অ্যাসাইলামে ঠিকানা হয় প্রদোষের। সেখানে থাকতে থাকতেই আর একটা পার্সোনালিটি ডেভেলপ করে প্রদোষ - নিজেকে মগনলাল মেঘরাজ ভাবতে শুরু করে। ভায়োলেন্ট নেচারটা তখনই ওর বেরিয়ে আসে। পরে কিন্তু আর কিছু মনে থাকে না - তখন আবার প্রদোষ। ওই অ্যাসাইলামেই দু'জন পেশেন্ট ওর হাতে খুন হয়, আর কয়েকজন ডক্টর আর ওয়ার্কারদেরও ভায়োলেন্টলি অ্যাসল্ট করে। একটা কনফারেন্সে কলকাতায় গিয়েছিলাম আমি। পঁচিশ বছর আগে। তখন ওর ফাইল দেখে ইন্টারেস্টেড হই। আমেরিকায় নিয়ে আসার আবেদন করি ফর রিসার্চ পার্পাস। মঞ্জুর হয়। হে ইজ হিয়ার এভার সিন্স।"
গ্লাসে চুমুক দেওয়ার জন্য থামলেন ভদ্রলোক।
"এখানেই ওর সাথে আর একটা কম বয়সি ইন্ডিয়ান ছেলের পরিচয়। একদম ওর ভাইয়ের বয়সী। হি স্টার্টেড কলিং হিম 'তোপসে'। ওর ধারণা হয় তোপসে ফিরে এসেছে।
আমাকে থেরাপিস্ট হিসেবে অ্যাক্সেপ্ট করতে সময় নেয় প্রদোষ। মাঝেমধ্যেই ভায়োলেন্ট হয়ে উঠত। কর্মচারীদের সাদা উর্দি দেখে বলত মগনলালের বেয়ারা। সো আই স্টেজড অ্যান ইন্সিডেন্ট। একটা ট্রেনের কোচ সাজানো হয়। সেখানে আই মেট দেম অ্যাজ আ কো-প্যাসেঞ্জার টু বি হিজ ফ্রেন্ড। টু গেট ক্লোজ টু হিম।
মজার ব্যাপার আমাকে হঠাৎ লালমোহনবাবু বলে ডাকতে শুরু করে প্রদোষ। আই ডোন্ট নো হোয়াই। ট্রিটমেন্ট চলতে থাকে। যখনই ভাবতাম রিকভার করছে ঠিক তখনই মগনলাল এসে হাজির হত। আবার কিছু না কিছু ইন্সিডেন্ট। আর প্রদোষ তোপসে আর আমাকে সাথে নিয়ে সেগুলোর তদন্তে নেমে পড়ত। পুরো ব্যাপারটাই আমি অবশ্য সুপারভাইজ করতাম। বছর ছয়েক হল মগনলাল আর প্রদোষের বাইরে আসেনি। আর প্রদোষও অ্যাক্সেপ্ট করে নিয়েছিলো যে ওর মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসর্ডার আছে। দেখে তো মনে হত সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু আমি জানতাম ওর ভেতরে কিন্তু মগনলাল এখনও বেঁচে। শুনলেন না। সরকার থেকে বোর্ড বসানো হল। এরমভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষকে নাকি আটকে রাখা উচিত না। ভালো কথা। অ্যান্ড আই হ্যাভ প্রুভড দ্যাট হি ইজ নট এলিজিবল টু গেট আউট অফ হিয়ার। যে ছেলেটাকে এত প্রেফার করত তারই কি হাল করল দেখুন।"
মুখ খুললেন অন্য ভদ্রলোক, " আর আমি যদি বলি আপনি গতকাল রাত্রে ওই 'তোপসে'কে নিয়ে প্রদোষের সেলে গিয়েছিলেন আবার লালমোহনের পার্সোনা নিয়ে? সরবতে LSD মেশানো টা? আপনি আজ পর্যন্ত কোনো পেশেন্টকে এখান থেকে যেতে দিয়েছেন ডক্টর কাওলি?"
ভদ্রলোকের চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় হিসহিসিয়ে ডক্টর কাওলি বললেন, "যে অভিযোগ তুমি প্রমাণ করতে পারবে না সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বোকামি টেডি। মনে রাখবে তুমিও কিন্তু এখনও সুস্থ নও। ইট ওয়াজ আ ওয়ার্নিং ফর ইউ অ্যাজ ওয়েল। প্রদোষের সাথে মিলে এখান থেকে পালানোর অপচেষ্টা এবার তাহলে বন্ধ হোক। মনে রেখো নোবডি লিভস দ্য শাটার আইল্যান্ড।"
(এটি একটি ফ্যানফিকশন। চরিত্রগুলি শ্রী সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট। আমার কোনোরকম ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নেই।)

Follow Nirban Ray and Onkar Nath in Facebook.