Wednesday, 4 October 2017

তৃষ্ণা (দ্বিতীয় পর্ব)

তৃষ্ণা (দ্বিতীয় পর্ব) - নির্বাণ
(প্রথম পর্ব পড়ার জন্য ক্লিক করুন)

[আলো নিভিয়ে পড়লে ভালো লাগবে]

সবেমাত্র লুচিটা ছিঁড়ে আলু ছেঁচকি দিয়ে মুখে পুড়েছি,  বাবা মুখ চুন করে ঘরে এসে ঢুকল। 
বাবার মুখ দেখেই মা বলে উঠল, "কিগো? মুখচোখ অমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে কেন?"
বাবা ধীরে ধীরে বলল, "আজ ভোরে সুশান্তর একটা অ্যাটাক হয়ে গেছে। মুনমুন ফোন করেছিল। এখন নার্সিংহোমে ভর্তি। অবস্থা ক্রিটিকাল।"
"সে কী!" মা আর আমি একসাথে চমকে উঠলাম।
"হুম, মুনমুন বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছে। একা মেয়েমানুষ বাচ্ছা ছেলেটাকে নিয়ে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। আর ওদের তো সেরম আত্মীয় স্বজনও কেউ নেই। আমি ছাড়া সুশান্তর তো আর কেউ...." বলতে বলতে গলা বুজে এল বাবার। চেয়ারে বসে পড়ল বাবা।
বাবার মন বুঝে নিয়ে মা হাঁক দিল, "কাকাবাবু, একবার শুনবেন?"
বাইরের দালানে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল সরকার দাদু। দাদু ঘরে আসতেই মা বলল, "আপনি রামকে এক্ষুনি একটা ট্যাক্সি ডাকতে বলুন। সুশান্ত নার্সিংহোমে ভর্তি। আমরা তিনজন ওখানেই রওনা দেবো। বেচারা বউটার কাছে গিয়ে না থাকলে কি করবে...."
আমি বলে উঠলাম, "ট্যাক্সি ডাকার দরকার নেই। আমিই ওলা ডেকে নিচ্ছি ফোনে। তোমরা দুজন রেডি হয়ে বড় রাস্তার দিকে চলো।"
- "তোমরা দুজন মানে? তুই যাবি না?"
- "পুজোর সময় আমি কলকাতা ছেড়ে নড়ছি না। বাবা নার্সিংহোম সামলাবে, তুমি ওদের ঘর সামলাবে। আমি গিয়ে লাভ হবে কি কিছু? তোমরা যাও। আমি বাড়ি সামলাবো। সরকার দাদু, রাম সিং আর সুখিয়া তো আছেই।"
বাবা কিছুক্ষণ স্থিরভাবে আমার দিকে চেয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মা কে বলল, "বাদ দাও। আমি একাই যাচ্ছি। দরকার নেই কারোর আসার।"

******

শেষ অবধি আমার কথাই রইল। বাবা আর মা কে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে প্যান্ডেলের দিকে চললাম। খারাপ লাগছিল। নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছিল। সুশান্তকাকু বাবার ছোটবেলার বন্ধু। প্রিয় বন্ধু যাকে বলে। আমার বাবার মতই সুশান্তকাকুও হাইস্কুলের টিচার - কাকুর পোস্টিং মেদিনীপুরে। বাবা ইতিহাস পড়ায় আর কাকু পড়ায় কেমিস্ট্রি। ছোটবেলা থেকেই গলায় গলায় দুজনের ভাব। পুজোর সময় কলকাতায় আমাদের বাড়িতে এসেই থাকে কাকু, কাকিমা আর ওদের ছেলে বিট্টু। বিট্টু এখন পড়ে ক্লাস সেভেনে।
কিন্তু নিজের মনকে কিছুতেই মানাতে পারলাম না। কলেজে উঠে এটা আমার প্রথম পুজো। কত্ত প্ল্যান হয়ে আছে বন্ধুদের সাথে।
প্যান্ডেলে গিয়ে ঠাকুরের কাছে ক্ষমা চেয়ে সুশান্তকাকুর সুস্থতা কামনা করে এলাম। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ঢুকে বুক ভরে একটা শ্বাস নিলাম। আমি স্বাধীন। গোটা বাড়িতে আমি একা। খুব সম্ভবত গোটা পুজোটাই একা। বাকিরা যদিও আছে তাও আমিই মালকিন বলে কথা। 
হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে সুদেষ্ণার মেজেস: 'পাক্কা সাড়ে এগারো কিন্তু। দেরী করবি না।'
এ বাবা! এগারোটা বাজতে পাঁচ! ঘড়ির দিকে খেয়ালই ছিলো না। তাড়াতাড়ি চান করতে দৌড়লাম।

******
ওলা ক্যাবটা যখন গলির মুখে নামিয়ে দিয়ে গেল তখন সন্ধে হব হব করছে। পাড়ার প্যান্ডেলের দিকে পা বাড়িয়েও থেমে গেলাম। আমাদের গলিতেই ঢুকলাম। সরু রাস্তায় একটা বাঁক নিতেই ঢাকের শব্দ যেন অনেকটা দূরে চলে গেল। দুধারে বিশাল বিশাল সাবেকি আমলের বাড়িগুলোর নোনাধরা দেওয়ালের মাঝখান দিয়ে গলিপথটা সাপের মত এঁকেবেঁকে এগিয়েছে। ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসা ঢাকের শব্দ যেন থমথমে নিস্তব্ধতাকে আরো ভারী করে তুলেছে। পোস্টে জ্বলে ওঠা হলদে ফ্যাকাশে বালবগুলোর দিকে তাকিয়ে গতকাল রাতের স্বপ্নের কথা আবার মনে পড়ে গেল। অন্ধকারটা যেন আরো একটু ঘন হয়ে এল। গাটা কেমন যেন শিরশিরিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে পা চালালাম।
সদর দরজাটা হাত দিয়ে ঠেলতেই ক্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল। অনেকদিন কব্জাগুলোতে তেল দেওয়া হয়নি। ভেতরে অন্ধকার। আমার পায়ে হাই হিল, ঢোকাটা রিস্কের। বিশাল বড় বড় থামগুলো আলো আঁধারিতে বহু বছরের ইতিহাসকে বুকে আঁকড়ে গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পরিত্যক্ত নাটমন্দিরটার ভেতর যেন শতাব্দীর অন্ধকার বাসা বেঁধেছে। ঝিঁঝিঁগুলোও যেন ডাকতে ভুলে গেছে। আমার গা ছমছম করে উঠল - নিজের বাড়িতে এই প্রথমবারের জন্য এরম অনুভূতি আমার হল। কেউ আলো জ্বালায়নি কেন?
বাড়িতে কি কেউ নেই? তাহলে সদর দরজায় তালা দেওয়া নেই কেন?

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। ফ্ল্যাশলাইট জ্বালারও উপায় নেই। ফোনটা সুইচ অফ। কালকে রাত্রে চার্জ দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ আবার সারাদিন নেট চলেছে।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। "সুখিয়া, সুখিয়া"।
হাঁক দিলাম। কোনো সাড়া নেই। "দাদু? ও দাদু.."
হঠাৎ দোতলায় কার্নিশ থেকে ফড়ফড় করে ডানা ঝাপটে কি একটা যেন মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। চমকে উঠলাম। প্যাঁচা হবে হয়তো। কালকে রাত্রের স্বপ্নটার কথা বার বার মনে হতে লাগল। জানলা আঁকড়ে অস্বাভাবিক ভাবে বসে ওটা কি ছিল? এত্ত আসল! সত্যি স্বপ্ন তো?
অনুভব করলাম হাতের আর পায়ের চেটোগুলো আবার ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে।
"স-সুখিয়া, দ-দাদু?"
আমার গলা কি একটু কেঁপে গেল?
কি আবোলতাবোল চিন্তা করছি! ধুর! নিজের বাড়িতে ভয় কিসের? দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেলাম দালানের দিকে। সিঁড়ির পাশেই সুইচবোর্ড। আলো জ্বলছে না, জ্বালিয়ে নেবো, ব্যাস। অত ভাবনা চিন্তার কি আছে?
দালানে উঠে সুইচবোর্ডের দিকে এগোতে যাচ্ছিলাম - অন্ধকারে আমার পায়ে লেগে নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে বিকট শব্দ করে কটা বাসন ছিটকে গেল। ঠিক সেই মূহুর্তে গলির দিক থেকে সমস্বরে কয়েকটা কুকুর কেঁদে উঠল।
প্রচন্ড চমকে গিয়ে সামনে তাকাতেই স্থির হয়ে গেলাম। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির পাশে আবছা সাদাটে একটা মূর্তি। মানুষের অবয়বই বটে। অন্ধকারে মনে হচ্ছে যেন শাড়ি পরে কোন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে।
- "ক-কে ওখানে? কে দাঁড়িয়ে আছে?"
চেঁচিয়ে বলতে গেলাম কিন্তু শুকনো গলা দিয়ে ফ্যাসফ্যাসে জড়ানো কিছু শব্দ বেরোল।
মূর্তিটা ধীরে ধীরে অদ্ভুত চালে আমার দিকে এগোতে শুরু করল। শরীরটাকে দুপাশে হেলিয়ে হেলিয়ে নি:সাড়ে এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে।  আমি আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পেছতে লাগলাম। অন্ধকারে ততক্ষণে একটু একটু চোখ সয়ে এসেছে। বুঝতে পারলাম একটা নারীমূর্তি, মাথায় ঘোমটা। হিলহিলে সাপের মত যেন তার চলন।
নিজেকে সাহসী বলে আমার যে ধারণাটা ছিল সেটা যে কতবড় ভুল তার প্রমাণ আমি নিজেই দিয়ে দিলাম। পেছন ফিরে ছুটতে গিয়ে পা মচকে ধরাশায়ী হলাম। প্রচন্ড যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলাম। ঠিক সেই সময় যেন ম্যাজিকের মত দালানের আলো জ্বলে উঠল।
******

"দিদিমণি কি হল? পড়ে গেলে কি করে?" ব্যস্ত হয়ে ছুটে এল সুখিয়া। যন্ত্রণায়, রাগে, ভয়ে তখন আমার চোখে জল এসে গেছে। 
- "কোথায় ছিলে তুমি? আলো জ্বালনি কেন?" চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
আমাকে হাত ধরে তুলতে তুলতে কাঁচুমাচুভাবে সুখিয়া বলল, "আমি পেছনের উঠোনে ছিলুম। বাসন মাজছিলুম। এই সবে আলো জ্বালতে এলুম।"
- "দাদু কই? আর রাম সিং?"
- "সরকারবাবু বাজারে গেছেন রাম সিংকে নিয়ে। আমি কি করে জানব তুমি এত তাড়াতাড়ি...."
আমার মুখের দিকে চোখ পড়তে থেমে গেল সুখিয়া।
আমার সামনে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে আধখানা ঘোমটা দিয়ে অত্যন্ত জড়সড় ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে একটা বউ। মেয়েদের তুলনায় বেশ অনেকটাই লম্বা, রোগাটে চেহারা।

আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির খেই ধরেই সুখিয়া বলল, "হেঁহেঁ, দিদিমণি ভয় পেয়েচ বুজি? ভয়ের কিছু নেই। ওকে আমিই এখানে দাঁড়াতে বলেছিলুম। মা ঠাকরুন আমাকে বলে গেসলো এই কদিনের জন্য একটা মেয়েছেলে কাজের লোক জোগাড় করতে। তুমি ছেলেমানুষ। বাড়িতে কোন মেয়েলোক না থাগলে ঠিক যত্ন আত্তি পাবে না। হেঁহেঁ, দিদিমণি ভয়ে পেয়েচে। দেখি দেখি পায়ে লাগল কি না...."
আমি লজ্জা পেয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বললাম, "তা এনাকে তুমি পেলে কোত্থেকে?"

- "ওই যো ঘাটের ধারে উপেনের দোকানে পান কিনতে যাই না? সেখেনেই মেয়েটার সাথে আলাপ। অনেকদিন ধরেই দেকচি - আসে, পান খায়। কারো সাতে পাঁচে নেই। তা আজ বিকেলে দেখি গিয়ে সে গঙ্গার ঘাটে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদচে। বলে কি না আগের বাড়ির বাবুরা মেরে তাড়িয়ে দেচে।"
ঘোমটার ভেতর বউটা ফুঁপিয়ে উঠল।
সুখিয়া বলে চলল, "তিনকুলে নাকি কেউ নেই। দেখে বড় মায়া হল। নিয়ে এলুম সাতে করে। মা ঠাকরুণও খুঁজছিলেন একজন মেয়েলো.... এই ঘোমটাটা সরা না। দিদিমণিকে মুকটা দেকা।"

বউটি ফ্যাটফ্যাটে সাদা শিরা ওঠা দুটো রোগা লম্বা লম্বা হাত দিয়ে ঘোমটাটা সরাতে মুখটা দেখতে পেলাম। অবাক হলাম।
এরম লম্বাটে মুখ আগে কারো দেখিনি। চিবুকের কাছটা সরু হয়ে অনেকটা নেমে এসেছে। খাড়া টিকালো নাকের দুপাশে দুটো গোলগোল জ্বলজ্বলে চোখ, অদ্ভুত ঠান্ডা দৃষ্টি - চোখ দিয়ে যেন শরীরের অনেক ভেতর অবধি উঁকি মারে। গালদুটো অনেকটা করে ঢোকা। গায়ের রঙ ফ্যাটফ্যাটে সাদা - অস্বাভাবিক সাদা।
আর মহিলার মুখের মধ্যে সব থেকে আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য যেটা চোখে পড়ল সেটা হল তার ঠোঁট।
ঠোঁটদুটো যেন গোল হয়ে লম্বাটে চোঙার মত আকৃতি সৃষ্টি করেছে আর মুখ ফ্যাকাশে সাদা হলে কি হবে ঠোঁটজোড়ার রঙ লাল - টকটকে লাল।

জিজ্ঞেস করলাম, "নাম কি তোমার?"
রক্তিম ঠোঁটজোড়া নড়ে উঠলো। খসখসে ঠান্ডা গলায় জবাব এলো, "আমার নাম রাসমণি।" (ক্রমশ)

[কদিন আগে একটা ব্লগে অনেক পুরনো কিছু ভূতের গল্পের সন্ধান পেয়েছি। ছোটবেলায় পড়া। আমার তো মনে হয় আমাদের দাদু দিদাদেরও ছোটবেলাকার - এত্ত পুরনো। তার মধ্যে থেকেই একটা গল্পের প্লটকে নতুনভাবে রিক্রিয়েট করার চেষ্টা করছি। টানা অনেক বড় পোস্ট দিলে পাঠকরা বোর হতে পারেন ভেবে কয়েকটা অংশে দেবো। কেমন লাগল জানাবেন। শেষে আসল গল্পের নামটা জানিয়ে দেবো। তার মধ্যে দেখি কে গেস করতে পারে।]

No comments:

Post a Comment