বিশু কোনোদিনও বরফ দেখেনি। পন্ডিতমশাই বলে নাকি খুব ঠান্ডা, কনকনে - হাতে রাখা যায় না বেশীক্ষণ, খুব টনটন করে। আঙুলের ডগাগুলো নাকি শিবঠাকুরের গায়ের মত কটকটে নীল হয়ে যায়। বিশু শিবঠাকুর দেখেছে। মুনষির হাটের চরকের মেলায়। গায়ে বাঘছাল, একহাতে ত্রিশূল আর অন্যহাতে ডুগডুগি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচ দেখিয়েছিল। খয়েরি সিঁদুরে ধুলো ওড়ানো নাচ। গলায় মোটা মোটা রুদ্রাক্ষের মালা, মাথায় বিশাল জটা আর গলায় জড়ানো মস্ত একটা সাপ। সবাই পয়সা ছুঁড়ছিল। কেউ বা কলাটা মুলোটা নামিয়ে রাখছিল মাটিতে। নাচ থামিয়ে ভামবেড়ালের ওঁৎ পাতা কায়দায় বসেছিল ঠাকুর থাবা গেড়ে। বুকটা উঠছিল নামছিল হাপরের মত হা হা করে। সাবানের সাদা ফ্যানার মত গ্যাঁজলা দেখেছিল ঠোঁটের কোণে। কাঁপা কাঁপা হাতে বিশু দুটো মেটে আলু নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল দেবে বলে - শিবঠাকুরের দখখিণে। লাল টকটকে দুটো চোখ। গাঢ় নীল ঘাড় গলা জড়িয়ে চকচকে কালো সাপটা ফোঁস করে উঠেছিল ফণা তুলে, হঠাৎ চমকে থরথরিয়ে কেঁপে উঠেছিল এগারো বছরের বিশে। ঘন নীল মুখে করমচা লাল টকটকে চোখজোড়া ওপর দিকে আদ্দেক তোলা - শিবনেত্তর।
বিলের অন্ধকার জলে ডুব গেলে গেঁড়ি তুলে আনে বিশু। ডুব সাঁতারে চরণির বিল এপার ওপার করে বছর এগারোর ছেলেটা। জলের তলাটা কি ঠান্ডা আর কালো! আচ্ছা বরফ কি এর চেয়েও বেশী ঠান্ডা? ডুবতে ডুবতে অবাক হয়ে বিশু ভাবতে থাকে। কালো জলের গভীরে কোনো শব্দ নেই, থমথমে চুপচাপ। পাকা মাগুরের মত জল কেটে এঁকেবেঁকে সাঁতরাতে থাকে। গাঁয়ের লোক বলে নাকি বিলের নীচে কয়েকশো মড়া বাচ্ছা পোঁতা আছে। ঠান্ডা জোলো আঁশটে অন্ধকারে চোখ চেয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করে ছোট্ট বিশু। কয়েকশো মানে কত? পঁচিশের চেয়েও বেশী? অবাক হয়ে ভাবতে ভাবতে গা ছমছম করে ওঠে বিশুর। তলার হড়হড়ে শ্যাওলা কাদায় হাত, পেট ঠেকে; পাঁচ সেরি পাকা কাতলার পিঠের মত কালো জল। বুকের ধুকপুকুনি মোটে থামতে চায় না। কিরকিরে কাদা সমেত একমুঠো গেঁড়ি তুলে নিয়ে ওপর দিকে শরীর ছেড়ে দেয় বিশু। হুহু করে উঠতে থাকে ওপরের দিকে। ছোট্ট মাথাটা ভুস করে ভেসে ওঠে জলের ওপর। বড় হাঁ করে হাওয়া গেলে সে। ছোট্ট বুকটা উঠছে নামছে - শিবঠাকুরের মত। ঘন কালচে নীল আকাশের পশ্চিমে একটুকরো টকটকে লাল কয়লায় মত সূর্য ভাসে বোসেদের বাঁশঝাড়ের মাথায়। যদ্দূর চোখ যায় কোনো মানুষের চিহ্ন নেই।
মাথার ওপর দিয়ে বকের ঝাঁক উড়ে যায়, ডাহুকের ডাকের সাথে সাথে লাল কয়লার ডেলাটাকে গিলতে থাকে চরণির ঝিল যার নীচে নাকি কয়েকশো মড়া বাচ্ছা পোঁতা।
মাথার ওপর দিয়ে বকের ঝাঁক উড়ে যায়, ডাহুকের ডাকের সাথে সাথে লাল কয়লার ডেলাটাকে গিলতে থাকে চরণির ঝিল যার নীচে নাকি কয়েকশো মড়া বাচ্ছা পোঁতা।
সাঁতরে পাড়ের দিকে এগোয় শ্যামা বাগদির ব্যাটা বিশু। বাপকে বিশু দেখেনি। শ্যামা নাকি ছিল দুঁদে লাঠিয়াল; আশে পাশের পঞ্চাশটা গাঁয়ের লোক একডাকে চিনত। অনেকে বলে শ্যামা বাগদি নাকি ডাকাত ছিল। ধরা পড়ে কালাপানি হয়েছে নয়তো ফাঁসি গেছে। কেউ তো বলে দলের লোকরাই হাত পা বেঁধে জ্যান্ত পুঁতে দিয়েছে এই চরণির বিলের কাদাতেই।
বামুন কায়েতের গাঁয়ের বাইরের দিকে বিশুদের চালাঘর - চরণির বিল আর বোসেদের বাঁশবাগানের মাঝে। কয়েকশো বিঘের জলা জমিতে শাপলা ফলে। গেঁড়ি গুগলি, ছোট মাছ, বড় মাছ, কাদা চিংড়ি। পাঠশালা থেকে বেরিয়ে চরণির ঝিল দাপিয়ে এটা সেটা তুলে ঘরে নিয়ে আসে বিশু। মাটির হাঁড়িতে বেধবা মা মেটে আলুর ঝোল রাঁধে। অল্প তেল দিয়ে কাদা চিংড়ির চচ্চড়ি আর লালচে মোটা চালের ভাত। বিশুর কি ভালোই না লাগে!
গেঁড়িগুলোকে কোঁচড়ে বেঁধে বিলের ধারে হাঁটু কাদায় নীচু হয়ে ঝুঁকে শাপলা তুলছিল বিশু। জোঁক লাগে হাতে পায়ে মাঝে মাঝে, কাদাজমি জোঁকের আড়ত। টানলেও ছাড়ে না। বাড়তে থাকে চামড়ার ফিতের মত। বাড়ি গিয়ে রক্তচোষাদের মুখে নুন ছড়িয়ে দিলেই টুপটাপ খসে পড়ে ছটফটিয়ে রক্ত উগড়ে শেষ।
গেঁড়িগুলোকে কোঁচড়ে বেঁধে বিলের ধারে হাঁটু কাদায় নীচু হয়ে ঝুঁকে শাপলা তুলছিল বিশু। জোঁক লাগে হাতে পায়ে মাঝে মাঝে, কাদাজমি জোঁকের আড়ত। টানলেও ছাড়ে না। বাড়তে থাকে চামড়ার ফিতের মত। বাড়ি গিয়ে রক্তচোষাদের মুখে নুন ছড়িয়ে দিলেই টুপটাপ খসে পড়ে ছটফটিয়ে রক্ত উগড়ে শেষ।
আজ অবশ্য বিশুরা বাড়িতে দুজন নয়। গতকাল থেকেই নয়। ভিনগাঁয়ের এক বামুন বউ এসে উঠেছে তাদের মাটির ঘরে। গতকাল ভোরে, যখন আকাশের কালো কেটে একটু একটু উনুনের ছাইয়ের মত রঙ হয় চাদ্দিকটা, প্রথম শালিক কি ফিঙেটা যখন ডেকে ওঠে আঁধার কেটে তখন বিলের পাড়ে বসে কাঁদছিল নাকি বউটা। দুব্বো ঘাসের ওপর মুক্তোর মত গোটা গোটা জলের ফোঁটা। গুল দেবে বলে কাদা আনতে গেছিল মা বিলের ধারে। মায়ের বড় মায়া। শ্বশুরবাড়ির লোকে নাকি তাকে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। বামুনের মেয়ে তাদের ঘরে থাকবে? ভয়ে ভয়ে শুধোয় শ্যামা বাগদির বেধবা। এক কথায় রাজি হয়ে যায় বউটা। বিশুর মন্দ লাগে না। কেউ তো আসেনা তাদের ঘরে। মায়ে পোয়ে থাকে। ভালোই হবে। গপ্প টপ্প শোনা যাবে ভিনগাঁয়ের। বউটা ভারী রোগা, আর কি লম্বা! তাদের গাঁয়ের রঘু চৌকিদারের মত লম্বা। অবাক হয়ে দেখে শ্যামবর্ণ বিশু; কি সাদা গায়ের রঙ! কিন্তু মুখের কাছটা ভারী অদ্ভুত। চোঙাটে, নলের মত। খসখসে মায়া জড়ানো গলায় কাছে ডাকে বিশুকে, "কি সোনা ছেলে গো, আয় বাবা কাছে এসে বোস।" বিশুর ভারী মায়া লাগে। চোখদুটো কেমন যেন - খ্যাঁকশিয়ালের মত না? তাও বিশুর খুব মায়া লাগে। আহা রে, কেউ নেই বোধহয় অভাগীর। থাকুক না বিশুদের ঘরে।
হঠাৎ শেষ বিকেলের নিস্তব্ধতাকে চিরে বিশুর কানে একটা কান্নার আওয়াজ এসে বিঁধল। বাচ্ছার কান্না। বাঘের গন্ধ পাওয়া হরিণের মত চমকে বিলের দিকে তাকাল বিশু। কান্নার শব্দটা এগিয়ে আসছে বিলের ওপর দিয়ে। জলের ওপর দিয়ে। বাড়ছে। একটা, দুটো, তিনটে নয় - অনেক কচি বাচ্ছা যেন একসাথে কাঁদছে। ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া; বিশুর কান ফাটার জোগাড়। শেষ বিকেলের মরা বেগনে আলোয় কেউ কোত্থাও নেই। শকুনের বাচ্ছার ডাকের মত ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া। সর্বাঙ্গে একটা শিহরণ খেলে গেল শ্যামা বাগদির ব্যাটার। আওয়াজটা বিলের জল তোলপাড় করে বিশুর দিকেই এগিয়ে আসছে। শাপলা ফেলে বিশু কাদার মধ্যে দিয়েই হাঁচোড়পাঁচোড় করে গা মাথা মুখ কালো চটচটে করে উঠে দাঁড়াল শক্ত ডাঙায়। গাঁয়ের ছেলে বিশে। এই বয়সেই এমন অনেক কিছু দেখেছে শুনেছে যা শহরের লোকেদের বীভৎসতম কল্পনারও বাইরে। গায়ে কাঁটা দেয় বিশুর। মা শিখিয়েছে ভয় পেলেই কালো ছায়াগুলো আরো চেপে বসবে, রক্তচোষা জোঁকের মত। গাঁয়ের লোকে সবাই জানে বাঁশঝাড়ে, খালে, বিলে, জঙ্গলে, পুকুরে, বাগানে এমন অনেক জিনিস আঁধার মেখে লুকিয়ে থাকে যাদের দেখেও দেখতে নেই, শুনেও শুনতে নেই। ধুকুপুকুনি নিয়েও বুক চিতিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে রামনাম জপতে থাকে বিশু। কান্নাটা বাড়তে বাড়তে এগিয়ে এসে বিশুর একদম কাছেই থেমেছে। কান্নাটা আর কান্না নেই। অদ্ভুত যন্ত্রণাময় অপার্থিব একটা গোঙানি বিলের কাদায় ছটফট করছে। স্তম্ভিত বিশু দেখল বিলের কাদা যেন জ্যান্ত হয়ে উঠে রূপ নিয়েছে অসংখ্য সদ্যোজাত শিশুর। অসংখ্য জোঁকের মত কিলবিলিয়ে গাদাগাদি করতে থাকে তাদের কাদাশরীর। সাথে অস্ফুট গোঙানি। আর দাঁড়ায় না বিশু। পেছন ফিরে বাড়ির দিকে দৌড় লাগায়। মা বলেছে পেছনে ফিরে তাকাতে নেই।
বোসেদের বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে সরু পায়ে চলা কাঁচা রাস্তা চলেছে বিশেদের চালাঘরের দিকে। সক্কালবেলাতেই অন্ধকার ঘুটঘুট করে। ঝিঁঝিঁরা পালাগান শোনাতে বসে। সন্ধের সময় তো কথাই নেই। বিশু অভ্যস্ত। অন্ধকারে বিশুর চলতে অসুবিধে হয় না। পায়ে থপাথপ আওয়াজ তুলে বিশু এগিয়ে চলে কালো আলকাতরার মত অন্ধকার চিরে। চুপিসারে চললে সাপে কাটে। লাউডগা, কেউটে, শাঁখামুঠি - সাপের শেষ নেই দেশেঘরে। লতা লতা লতা।
বিলের জিনিস বিলেই থাকে - ধাওয়া করে না। বিশু জানে। বাঁশবাগানেও অনেক ভয়ের জিনিস আছে। শুধু ভয় না পেলেই হল। দূরে একটা শেয়াল ডাকে। বাঁশবাগানেরই দু তিন জায়গা থেকে সাড়া আসে। ডাক চলতেই থাকে। হুউউউউউউউউ...... হুউউউউউউ.....
মাটিতে আড়াআড়ি পড়ে থাকা বাঁশগুলো ডিঙোতে নেই। ঘুরে যেতে হয়। গাঁয়ের সবাই জানে। পা চালায় বিশু। মা এতক্ষণে মাটির হাঁড়িতে ভাত বসিয়ে দিয়েছে। ইশশশশ! শাপলাগুলো ফেলে এলো বিশু। তাও গেঁড়ির ঝাল দিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের চিন্তায় পেটের খিদে আরো চনচনিয়ে ওঠে বিশ্বনাথের। সামনে বাবলা গাছের ঝাড়টা পেরোলেই তাদের মাটির ঘর। সেই বামুন বউ কি করছে কে জানে!
বাবলা গাছটা পেরিয়ে থমকে দাঁড়াল বিশু। চারিদিকে জঙ্গলের মধ্যে ফাঁকা গোল পরিষ্কার জায়গাটায় তাদের কুঁড়েঘর। দাওয়ার ঠিক সামনে একটা তুলসীগাছ। সন্ধে হতেই মা তার সামনে তেলের বাতি জ্বালে। ঝকঝকে নিকোনো উঠোনে উনুনে আঁচ দেয় মা। কিন্তু আজ সব অন্ধকার। আলো জ্বলেনি। না ঘরে, না তুলসীতলায়, না উঠোনে।
বাবলা গাছটা পেরিয়ে থমকে দাঁড়াল বিশু। চারিদিকে জঙ্গলের মধ্যে ফাঁকা গোল পরিষ্কার জায়গাটায় তাদের কুঁড়েঘর। দাওয়ার ঠিক সামনে একটা তুলসীগাছ। সন্ধে হতেই মা তার সামনে তেলের বাতি জ্বালে। ঝকঝকে নিকোনো উঠোনে উনুনে আঁচ দেয় মা। কিন্তু আজ সব অন্ধকার। আলো জ্বলেনি। না ঘরে, না তুলসীতলায়, না উঠোনে।
বাবলা গাছের ডালে বসা প্যাঁচাটা বনবন করে মাথা ঘোরায়। পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে বিশু। চারিদিকে কালো কালো গাছের মাথার ভিড়ে খোলা একটুকরো গোল আকাশ। কদিন আগেই পূর্ণিমা গেছে। ক্ষয়াটে চাঁদের আলোর তেমন জোর না থাকলেও বিশুদের কাজ চলে যায়।
'মা' বলে ডাকতে গিয়েও থমকে যায় বিশু। ন্যাংটো বয়স থেকেই জলা জঙ্গল চষা অভ্যেস - ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন তাকে আওয়াজ করতে নিষেধ করে। ঠান্ডা লাগে বিশুর। কনকনে ঠান্ডা। বুকের ধুকপুকুনিটা আবার শুরু হয়ে যায়। সন্তর্পণে দাওয়ায় উঠে হালকা করে দরজা ঠেলে বিশু ঘরে উঁকি মারে। ফাঁকা। কেউ নেই। গলা শুকিয়ে কাঠ। অন্ধকার দাওয়ায় ভূতের মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বিশু। হঠাৎ খড়মড় আওয়াজ করে ঘরের পেছন দিক থেকে কি একটা ছুটে বেরিয়ে এসে সাঁৎ করে বাঁশবনে গিয়ে সেঁধোয়। খটাশ বা ভাম। ভয়ে পালাল। কেন? বিশু নিজের ইন্দ্রিয়কে অনুসরণ করে। মাটির কুঁড়ের বাঁ দিয়ে আস্তে আস্তে কোনো শব্দ না করে এগোতে থাকে ছোট্ট বিশ্বনাথ। ঘরের পেছনেই একটা ডোবা। চারিদিকে ঝোপ জঙ্গল। ঘরের মাটির ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এগোতে থাকে বিশু। একটা কালো মেঘ এসে কম্বলের মত চাঁদটাকে মুড়ে দিয়েছে।
'মা' বলে ডাকতে গিয়েও থমকে যায় বিশু। ন্যাংটো বয়স থেকেই জলা জঙ্গল চষা অভ্যেস - ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন তাকে আওয়াজ করতে নিষেধ করে। ঠান্ডা লাগে বিশুর। কনকনে ঠান্ডা। বুকের ধুকপুকুনিটা আবার শুরু হয়ে যায়। সন্তর্পণে দাওয়ায় উঠে হালকা করে দরজা ঠেলে বিশু ঘরে উঁকি মারে। ফাঁকা। কেউ নেই। গলা শুকিয়ে কাঠ। অন্ধকার দাওয়ায় ভূতের মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বিশু। হঠাৎ খড়মড় আওয়াজ করে ঘরের পেছন দিক থেকে কি একটা ছুটে বেরিয়ে এসে সাঁৎ করে বাঁশবনে গিয়ে সেঁধোয়। খটাশ বা ভাম। ভয়ে পালাল। কেন? বিশু নিজের ইন্দ্রিয়কে অনুসরণ করে। মাটির কুঁড়ের বাঁ দিয়ে আস্তে আস্তে কোনো শব্দ না করে এগোতে থাকে ছোট্ট বিশ্বনাথ। ঘরের পেছনেই একটা ডোবা। চারিদিকে ঝোপ জঙ্গল। ঘরের মাটির ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এগোতে থাকে বিশু। একটা কালো মেঘ এসে কম্বলের মত চাঁদটাকে মুড়ে দিয়েছে।
ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের ডাকের সাথে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছে ঘরের পেছনদিক থেকে। গেলবারের বারোয়ারি কালীপুজোর ভোজে ঘোষালবুড়োর খাওয়া দেখেছিল বিশু। দাঁতছাড়া মাড়ি দিয়ে আজব কায়দায় পাঁঠার হাড় চুষছিল বুড়ো - সলাৎ সলাৎ করে আওয়াজ হচ্ছিল। অবাক চোখে চেয়েছিল সে।
আওয়াজটা কিছুটা সেরকমই কিন্তু আরো জোরালো - শুনলেই কিরম ভয় লাগে। ভয়ে অবশ শরীরটাকে কোনমতে ঝুঁকিয়ে ডোবার পাড়ে চোখ রাখল বিশু। ঝোপের পাশ থেকে দুটো পা বেরিয়ে, চিত হয়ে কেউ শুয়ে আছে। অল্প অল্প নড়ছে পা দুটো। অজানা ভয়ে বিশুর গলার কাছে একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠল। বাবলা গাছের কাছে একটা শেয়াল ডেকে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে রাম নাম জপতে জপতে ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল বিশু। চাঁদটা আবার আস্তে আস্তে উঁকি মারছে কালো মেঘের চাদর সরিয়ে। ঠান্ডা ঘামে ভেজা কাদা জড়ানো শরীরে চাঁদের আলো পড়ে প্যাঁকাল মাছের মত চকচক করছে তার গা।
আওয়াজটা কিছুটা সেরকমই কিন্তু আরো জোরালো - শুনলেই কিরম ভয় লাগে। ভয়ে অবশ শরীরটাকে কোনমতে ঝুঁকিয়ে ডোবার পাড়ে চোখ রাখল বিশু। ঝোপের পাশ থেকে দুটো পা বেরিয়ে, চিত হয়ে কেউ শুয়ে আছে। অল্প অল্প নড়ছে পা দুটো। অজানা ভয়ে বিশুর গলার কাছে একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠল। বাবলা গাছের কাছে একটা শেয়াল ডেকে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে রাম নাম জপতে জপতে ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল বিশু। চাঁদটা আবার আস্তে আস্তে উঁকি মারছে কালো মেঘের চাদর সরিয়ে। ঠান্ডা ঘামে ভেজা কাদা জড়ানো শরীরে চাঁদের আলো পড়ে প্যাঁকাল মাছের মত চকচক করছে তার গা।
ঝোপটা পেরোতেই চাঁদটাও পুরো বেরিয়ে এল আর এক বীভৎস উৎকট দৃশ্যে বিশুর মাথা বনবনিয়ে ঘুরতে লাগল। ডোবার দিকে মাথা আর বিশুর দিকে পা করে চিত হয়ে পড়ে আছে মা। মায়ের মাথাটা অদৃশ্য হয়েছে সেই বামুন বউয়ের হাঁয়ের মধ্যে। সাপের ব্যাঙ গেলার ভঙ্গিতে চার হাত পায়ে উপুড় হয়ে বসে আছে বউটা - মুখের হাঁ টা বড় জোঁকের মত মায়ের গোটা মাথাটাকে আঁকড়ে ধরেছে। গোটা শরীরটা তিরতিরিয়ে কাঁপছে আর আওয়াজ হচ্চে সলাৎ সলাৎ সলাৎ সলাৎ।
বিশুর গা গুলিয়ে উঠল, হড়াৎ করে বমি করে ফেলল। খালি পেটের পিত্ত জল বেরিয়ে এলো চোয়াল গড়িয়ে। বউটা চকিতে চোখ তুলল। মায়ের মাথাটা ছেড়ে দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে উঠে দাঁড়াল। প্রচন্ড ভয়ে বিশু ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল। হিলহিলে জোঁকের মতই সে এগিয়ে এল বিশুর দিকে। চাঁদের আলোয় বিশু দেখল দুটো জ্বলজ্বলে দুটো গোল গোল চোখ। সেই চোখের গোটাটাই উজ্জ্বল কালো। আর চোখের নীচে একটা কালো হাঁ। হাঁড়ির মুখের মত বড় নিটোল গোল একটা হাঁ! কি এটা! এটা কি! অন্ধকার জঙ্গলের নির্জনতা ভেঙে সীমাহীন আতঙ্কে গলা চিরে চেঁচিয়ে উঠল বিশু।
ভোজবাজির মত যেন মাটি ফুঁড়ে কোত্থেকে উদয় হল একটা ঢ্যাঙা লোক। বিশু আর সেই ভয়ঙ্কর জিনিসটার মাঝে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ডান হাতে ত্রিশূল উঁচিয়ে হুঙ্কার ছাড়ল, "এইইইই থাম!"
গুটিয়ে গিয়ে হাঁ বন্ধ করে কয়েকপা পিছিয়ে গেল জিনিসটা - জ্বলজ্বলে চোখদুটো কুঁচকে চাপা গর্জন করে উঠল। এরম আওয়াজ বিশু কক্ষণো শোনেনি। আতঙ্কে সারা শরীর অবশ হয়ে এল বিশুর।
"খবদ্দারররর! সালা নোংরা কীট.... এক পাও এগুবি না... তিরশূল গেঁতে দোবো...."
ভীষণ রাগে মুখের বিকট হাঁ টা বড় করে আরো একবার এগিয়ে এলো সেইটা - বিশে দেখল থালার মত বড় গোল হাঁয়ের গোটাটা ঘিরের করাতের মত দাঁতের সারি।
বাঘছাল পরা লোকটা "তবে রে নর্ রকের কীট! মর সালা...." বলে বাঁ হাতের মুঠো থেকে কিছু ছুঁড়ে দিল হাঁ করা মুখের দিকে।
রক্ত জল করা একটা চিৎকার ছেড়ে মাটিতে ছিটকে পড়ে ছটকাতে লাগল সেই দানবিক মূর্তি। লোকটা বাঁ হাতের মুঠোয় আবার কি নিয়ে ছোঁড়ার উপক্রম করতেই সড়সড় করে চোখের নিমেষে এঁদো ডোবায় নেমে পানা জল তোলপাড় করে ওপারে গিয়ে উঠল। অন্ধকারে আধা অজ্ঞান বিশু শুনতে পেল গাছপালা ভেঙে কি যেন খুব জোরে ছুটে পালাচ্ছে। নিজের ছোট্ট শরীরটাকে মায়ের নিথর দেহটার ওপর ছুঁড়ে দিয়ে বিশ্বনাথ দেখল মা আর নড়ছে না। চাঁদের ফ্যাসফ্যাসে মড়া আলোয় দেখা গেল মায়ের মাথার দিকটা আর চেনা যাচ্ছে না।
জ্ঞান হারানোর আগে বিশে আবছা শুনতে পেল, "এই ব্যাটা.... চল এখেন থেকে... চল বলচি.." হাতে একটা শক্ত হ্যাঁচকা টান।
সজনে ডাঁটার ছিবড়ে বিশু দেখেছে।
মায়ের মাথাটা..... বিশুর দুচোখে বিলের গভীর জলের মত অন্ধকার নেমে এল।
গুটিয়ে গিয়ে হাঁ বন্ধ করে কয়েকপা পিছিয়ে গেল জিনিসটা - জ্বলজ্বলে চোখদুটো কুঁচকে চাপা গর্জন করে উঠল। এরম আওয়াজ বিশু কক্ষণো শোনেনি। আতঙ্কে সারা শরীর অবশ হয়ে এল বিশুর।
"খবদ্দারররর! সালা নোংরা কীট.... এক পাও এগুবি না... তিরশূল গেঁতে দোবো...."
ভীষণ রাগে মুখের বিকট হাঁ টা বড় করে আরো একবার এগিয়ে এলো সেইটা - বিশে দেখল থালার মত বড় গোল হাঁয়ের গোটাটা ঘিরের করাতের মত দাঁতের সারি।
বাঘছাল পরা লোকটা "তবে রে নর্ রকের কীট! মর সালা...." বলে বাঁ হাতের মুঠো থেকে কিছু ছুঁড়ে দিল হাঁ করা মুখের দিকে।
রক্ত জল করা একটা চিৎকার ছেড়ে মাটিতে ছিটকে পড়ে ছটকাতে লাগল সেই দানবিক মূর্তি। লোকটা বাঁ হাতের মুঠোয় আবার কি নিয়ে ছোঁড়ার উপক্রম করতেই সড়সড় করে চোখের নিমেষে এঁদো ডোবায় নেমে পানা জল তোলপাড় করে ওপারে গিয়ে উঠল। অন্ধকারে আধা অজ্ঞান বিশু শুনতে পেল গাছপালা ভেঙে কি যেন খুব জোরে ছুটে পালাচ্ছে। নিজের ছোট্ট শরীরটাকে মায়ের নিথর দেহটার ওপর ছুঁড়ে দিয়ে বিশ্বনাথ দেখল মা আর নড়ছে না। চাঁদের ফ্যাসফ্যাসে মড়া আলোয় দেখা গেল মায়ের মাথার দিকটা আর চেনা যাচ্ছে না।
জ্ঞান হারানোর আগে বিশে আবছা শুনতে পেল, "এই ব্যাটা.... চল এখেন থেকে... চল বলচি.." হাতে একটা শক্ত হ্যাঁচকা টান।
সজনে ডাঁটার ছিবড়ে বিশু দেখেছে।
মায়ের মাথাটা..... বিশুর দুচোখে বিলের গভীর জলের মত অন্ধকার নেমে এল।
******
ট্রেন ছুটছে কলকাতার দিকে। পন্ডিত মশাইয়ের কাছে বিশু শুনেছিল কলকাতা নাকি খুব বড় শহর। বিশু কখনো শহর দেখেনি।
জানলার ধারে বসা বিশুর চোখের জল শুকিয়ে গালে খরখরে মরা পড়ে গেছে। কামরা ফাঁকা। বাইরের গাছগুলো কেমন হু হু করে পেছন দিকে ছুটছে। জ্ঞান ফেরার পর দুদিন ধরে বিশু পাগলের মত কেঁদেছে। কান্না আর আসছে না। বুকে চাপা একটা বোবা কষ্ট। ক্লান্ত চোখে শিবঠাকুরের দিকে তাকাল সে। মুনষির হাটের শিবঠাকুর ট্রেনের সিটে ঠ্যাঙ তুলে বসে আরাম করে বিড়ি টানছে। গায়ের কটকটে নীল রঙ জায়গায় জায়গায় উঠে তামাটে চামড়া দেখা যাচ্ছে। বিশু চাইতে ভুরু নাচিয়ে বলে উঠল, "কিরে? টেরেনে চড়েচিস কখ্নো?"
দুর্বল গলায় বিশু বলল, "ওটা কি ছিল?"
গম্ভীর হয়ে ঠাকুর বলল, "ওসব জিনিসের নাম নেই।থাকলেও নিতে নেই। ওরম অনেক শয়তানের বাচ্চাদের ভব বোরূপী শায়েস্তা করেচে।"
ট্যাঁক থেকে ময়লা লাল কাপড়ে মোড়া শক্ত লম্বামত কি একটা বার করে বিশুর হাতে গুঁজে দিয়ে বললে, "এটে কাছ ছাড়া করবিনে ককনো।"
বিশু খুলে দেখে কিসের একটা দাঁত। হলদেটে, কুকুরের দাঁতের মত কিন্তু অনেক বড় আর হাতের চেটোর মতন লম্বা।
"এটা কিসের দাঁত ঠাকুর?"
- "আহ্! তোর অত জেনে কি দরকার? ছোঁড়াটার না সবেতে কি আর কি.... এ যে জিনিসের দাঁত তার নাম তুই কেন তোর চোদ্দপুরুষে কেউ কখনো শোনেনি। যা বলছি কর।" খিঁচিয়ে ওঠে ভব বোরূপী।
"আর শোন তোকে যেখানে নে যাচ্চি সেটা ভদ্দলোকের বাড়ি। অনেক বড় জমিদারবাড়ি। শালারা বামুন। বড়কত্তা খুব ভালো লোক কিন্তু বাগদীর পো শুনলেই তায়ড়ে দেবে। তাই তুই বলবি তোর নাম বিশু সরকার। হ্যাঁ? বাপ মা পটল তুলেচে আর তিনকুলে কেউ নেই।"
শ্রান্তভাবে ঘাড় নাড়ে বিশু।
ভব শুধোয় আবার, "কি নাম বলবি? গোটা নাম বল।"
- "বিশু সরকার.... বিশ্বনাথ সরকার।"
ট্রেন ছুটছে কলকাতার দিকে। পন্ডিত মশাইয়ের কাছে বিশু শুনেছিল কলকাতা নাকি খুব বড় শহর। বিশু কখনো শহর দেখেনি।
জানলার ধারে বসা বিশুর চোখের জল শুকিয়ে গালে খরখরে মরা পড়ে গেছে। কামরা ফাঁকা। বাইরের গাছগুলো কেমন হু হু করে পেছন দিকে ছুটছে। জ্ঞান ফেরার পর দুদিন ধরে বিশু পাগলের মত কেঁদেছে। কান্না আর আসছে না। বুকে চাপা একটা বোবা কষ্ট। ক্লান্ত চোখে শিবঠাকুরের দিকে তাকাল সে। মুনষির হাটের শিবঠাকুর ট্রেনের সিটে ঠ্যাঙ তুলে বসে আরাম করে বিড়ি টানছে। গায়ের কটকটে নীল রঙ জায়গায় জায়গায় উঠে তামাটে চামড়া দেখা যাচ্ছে। বিশু চাইতে ভুরু নাচিয়ে বলে উঠল, "কিরে? টেরেনে চড়েচিস কখ্নো?"
দুর্বল গলায় বিশু বলল, "ওটা কি ছিল?"
গম্ভীর হয়ে ঠাকুর বলল, "ওসব জিনিসের নাম নেই।থাকলেও নিতে নেই। ওরম অনেক শয়তানের বাচ্চাদের ভব বোরূপী শায়েস্তা করেচে।"
ট্যাঁক থেকে ময়লা লাল কাপড়ে মোড়া শক্ত লম্বামত কি একটা বার করে বিশুর হাতে গুঁজে দিয়ে বললে, "এটে কাছ ছাড়া করবিনে ককনো।"
বিশু খুলে দেখে কিসের একটা দাঁত। হলদেটে, কুকুরের দাঁতের মত কিন্তু অনেক বড় আর হাতের চেটোর মতন লম্বা।
"এটা কিসের দাঁত ঠাকুর?"
- "আহ্! তোর অত জেনে কি দরকার? ছোঁড়াটার না সবেতে কি আর কি.... এ যে জিনিসের দাঁত তার নাম তুই কেন তোর চোদ্দপুরুষে কেউ কখনো শোনেনি। যা বলছি কর।" খিঁচিয়ে ওঠে ভব বোরূপী।
"আর শোন তোকে যেখানে নে যাচ্চি সেটা ভদ্দলোকের বাড়ি। অনেক বড় জমিদারবাড়ি। শালারা বামুন। বড়কত্তা খুব ভালো লোক কিন্তু বাগদীর পো শুনলেই তায়ড়ে দেবে। তাই তুই বলবি তোর নাম বিশু সরকার। হ্যাঁ? বাপ মা পটল তুলেচে আর তিনকুলে কেউ নেই।"
শ্রান্তভাবে ঘাড় নাড়ে বিশু।
ভব শুধোয় আবার, "কি নাম বলবি? গোটা নাম বল।"
- "বিশু সরকার.... বিশ্বনাথ সরকার।"
******
"সরকার বাবু?" পেছন থেকে এসে আস্তে করে ডাকে রাম সিং। "বাড়ি যাবেন না বাবু? দিদিমণি হয়তো এসে গেছে।"
"সরকার বাবু?" পেছন থেকে এসে আস্তে করে ডাকে রাম সিং। "বাড়ি যাবেন না বাবু? দিদিমণি হয়তো এসে গেছে।"
ধুতির খুঁটে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালেন বিশু সরকার - শ্যামা বাগদীর ছেলে। বাষট্টি বছর কেটে গেল কলকাতায়। তাও সেদিনের রাতের কথাটা আজও ভুলতে পারেননি।
পুজোর সময়টা এলেই মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ে আজকাল। আহিরীটোলার গঙ্গার ঘাটে সন্ধের হালকা ঝিরঝিরে বাতাস যেন বয়ে আনে মেটে আলু সেদ্ধ আর কাদাচিঙড়ির চচ্চড়ির গন্ধ।
"হ্যাঁ চল। দিদিমণিটা আবার অন্ধকারে ভয় পাবে। সুখেকে তো চিনি। সে হতভাগা নির্ঘাত আলো জ্বালতে ভুলেছে।"
পুজোর সময়টা এলেই মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ে আজকাল। আহিরীটোলার গঙ্গার ঘাটে সন্ধের হালকা ঝিরঝিরে বাতাস যেন বয়ে আনে মেটে আলু সেদ্ধ আর কাদাচিঙড়ির চচ্চড়ির গন্ধ।
"হ্যাঁ চল। দিদিমণিটা আবার অন্ধকারে ভয় পাবে। সুখেকে তো চিনি। সে হতভাগা নির্ঘাত আলো জ্বালতে ভুলেছে।"
******
"হুঁ। তা তোমাদের ওই হিলতোলা জুতো পরলে ঠ্যাঙ তো মচকাবেই মা।"
কড়িকাঠে একটা টিকটিকি ডেকে ওঠে।
একতলায় বাবা মায়ের ঘরে বিছানায় শোয়া মেয়েটা প্রতিবাদ করে ওঠে, "নাগো দাদু, বেচারা রাসমণি অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিল না? দেখে আমি এমন ভয়ে পেয়ে গেছিলাম.... হিহিহিহি...."
পায়ের গোছ ফুলে ঢোল। দোতলায় ওঠার থেকে এখানেই থাকা ভালো। বাবা-মা ও তো নেই। সুখিয়া ল্যাপিটা ওপরের ঘর থেকে এনে দিয়েই রান্নাঘরে ছুটেছে চুন হলুদ গরম করতে।
"বুঝলাম। তা তুমি তাহলে ঠাকুর দেখবে কি করে মা?"
"রিল্যাক্স দাদু, ঠিক হয়ে যাবে। চাপ নিও না। চিল।"
- "চিল শকুন বাদ দাও। রাসমণিটা আবার কে?"
- "সুখিয়া নিয়ে এসেছে। মা একজন মেয়ে খুঁজছিল না? ঘরের কাজ করার জন্য... খুব দু:খী মেয়ে দাদু। ওই তো রাসমণি চা এনেছে.... এসো এসো।"
রঙিন কাচের আর্চ মাথায় করে দাঁড়িয়ে বিরাট দরজা। তার ভারী পর্দা সরিয়ে চায়ের ট্রে হাতে ঘোমটা মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে রাসমণি।
খাটের পাশের টেবিলে ট্রে নামিয়ে ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়াল সে।
"চা নাও দাদু। উমমমম! দারুণ করেছ তো রাসমণি।"
সরকারমশাই চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে "আহ্!" বলে একটা তৃপ্তির আওয়াজ ছেড়ে বললেন, "ঘোমটা টা নামাতে পারো। আজকাল আর এসব কে করে? যাকে তাকে তো রাখতে পারি না। দেখি.... "
ফুলকাটা চায়ের কাপে দ্বিতীয় চুমুকটা দিলেন সরকার।
রাসমণি ঘোমটা নামিয়ে দাঁড়িয়েছে। টকটকে লাল চোঙার মত ঠোঁটটা জিভ দিয়ে চেটে নিল একবার। মাথা তুলে তাকালেন বিশ্বনাথ সরকার।
এই চোখ বিশু দেখেছে।
হাত থেকে চায়ের পেয়ালাটা সশব্দে মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। (চলবে)
"হুঁ। তা তোমাদের ওই হিলতোলা জুতো পরলে ঠ্যাঙ তো মচকাবেই মা।"
কড়িকাঠে একটা টিকটিকি ডেকে ওঠে।
একতলায় বাবা মায়ের ঘরে বিছানায় শোয়া মেয়েটা প্রতিবাদ করে ওঠে, "নাগো দাদু, বেচারা রাসমণি অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিল না? দেখে আমি এমন ভয়ে পেয়ে গেছিলাম.... হিহিহিহি...."
পায়ের গোছ ফুলে ঢোল। দোতলায় ওঠার থেকে এখানেই থাকা ভালো। বাবা-মা ও তো নেই। সুখিয়া ল্যাপিটা ওপরের ঘর থেকে এনে দিয়েই রান্নাঘরে ছুটেছে চুন হলুদ গরম করতে।
"বুঝলাম। তা তুমি তাহলে ঠাকুর দেখবে কি করে মা?"
"রিল্যাক্স দাদু, ঠিক হয়ে যাবে। চাপ নিও না। চিল।"
- "চিল শকুন বাদ দাও। রাসমণিটা আবার কে?"
- "সুখিয়া নিয়ে এসেছে। মা একজন মেয়ে খুঁজছিল না? ঘরের কাজ করার জন্য... খুব দু:খী মেয়ে দাদু। ওই তো রাসমণি চা এনেছে.... এসো এসো।"
রঙিন কাচের আর্চ মাথায় করে দাঁড়িয়ে বিরাট দরজা। তার ভারী পর্দা সরিয়ে চায়ের ট্রে হাতে ঘোমটা মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে রাসমণি।
খাটের পাশের টেবিলে ট্রে নামিয়ে ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়াল সে।
"চা নাও দাদু। উমমমম! দারুণ করেছ তো রাসমণি।"
সরকারমশাই চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে "আহ্!" বলে একটা তৃপ্তির আওয়াজ ছেড়ে বললেন, "ঘোমটা টা নামাতে পারো। আজকাল আর এসব কে করে? যাকে তাকে তো রাখতে পারি না। দেখি.... "
ফুলকাটা চায়ের কাপে দ্বিতীয় চুমুকটা দিলেন সরকার।
রাসমণি ঘোমটা নামিয়ে দাঁড়িয়েছে। টকটকে লাল চোঙার মত ঠোঁটটা জিভ দিয়ে চেটে নিল একবার। মাথা তুলে তাকালেন বিশ্বনাথ সরকার।
এই চোখ বিশু দেখেছে।
হাত থেকে চায়ের পেয়ালাটা সশব্দে মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। (চলবে)
[লেখাটা যখন শুরু করি তখন বলেছিলাম অনেক পুরোনো একটা ভূতের গল্পকে রিক্রিয়েট করবো। বলেছিলাম দেখি কে নাম গেস করতে পারে। অনেকেই সঠিক আন্দাজ করেছেন। যেখান থেকে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি সেই গল্পটির নাম 'রাসমণির গল্প'। বাণী রায়ের লেখা। তবে আমি ডিসাইড করেছি খোলনলচে পালটে ফেলার। 'রাসমণি' নামটা আর প্রোটাগনিস্ট মেয়েটিকে ধার নিয়েছি মাত্র। তিনটে পর্বেই বাকি ৯৫% সম্পূর্ণ বদলেছি। দেখা যাক কিরম লাগে।] - নির্বাণ

No comments:
Post a Comment