Showing posts with label Translated: English to Bengali. Show all posts
Showing posts with label Translated: English to Bengali. Show all posts

Thursday, 9 May 2019

।।মাছি।।
[ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ডের বিখ্যাত, বহুপঠিত ও চর্চিত ছোটগল্প ‘দ্য ফ্লাই’ এর অনুবাদ।]
অনুবাদকঃ নির্বাণ রায়।

কচি বাচ্ছারা যেমন খাটের ধার দিয়ে উঁকি মারে ঠিক তেমনি করে সবুজ চামড়ার দামড়া হাতচেয়ারের কোল থেকে তার বন্ধু বসের ডেস্কের দিকে জুলজুল করে চেয়ে বুড়ো উডিফিল্ড বেশ গদগদ হয়ে বলল, “আহহ! বেশ আরামে আছ কিন্তু তুমি ভায়া!” কথাবার্তা ততক্ষণে সব শেষ; বুড়োর এবার বিদেয় হবার পালা। কিন্তু বুড়ো কি সহজে নড়তে চায়? সেই যবে থেকে রিটায়ার করেছে, বিশেষ করে ওই স্ট্রোকটা যবে থেকে হয়েছে বুড়োর বউ আর মেয়েরা তাকে ঘরে একরকম বাক্সবন্দী করেই রেখেছে। তারা স্রেফ মঙ্গলবারেই চুল ফুল আঁচড়ে, ভাল জামা ফামা পরে বুড়োকে পাড়া বেরোতে দেয়। বাকি দিন ওই ঘরেই বসিয়ে রাখে। তাও বেরতে দিয়ে স্বস্তি কি আর পায়? কে জানে বুড়োটা আবার কখন কি কান্ড বাঁধিয়ে বসে, বন্ধুবান্ধবদের কাছে বরাবরের মত হ্যালহ্যাল করতে গিয়ে প্রেস্টিজ না খুইয়ে বসে – এইসব চিন্তায় তাদের মন হাঁকপাঁক করে। কিন্তু কি আর করা যাবে? গাছ যেমন শীতের সময় নিজের শেষ পাতাটাকে সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়, আমরাও হয়তো তেমনি নিজদের শেষ শখ আহ্লাদগুলো মেটানোর জন্য বড্ড লোভী হয়ে পড়ি। এই যেমন বুড়ো উডিফিল্ড এখন তার বন্ধু বসের অফিসে বসে চুরুট ফুঁকতে ফুঁকতে লোভী কাকের মত তার দিয়ে তাকিয়ে আছে। আর বস? নিজের অফিস চেয়ারে আরাম করে গা এলিয়ে বসে, উডিফিল্ডের থেকে বয়সে বছর পাঁচেকের বড় হলেও দেখে বোঝার উপায় নেই মোটে; গোলাপের মত গায়ের রঙ, তাক লাগানো শরীরস্বাস্থ্য, দিনদিন যেন আরো তাগড়া চেহারা হচ্ছে বসের। আহা, মানুষটাকে দেখলেও মনে বল পাওয়া যায়।
বুড়ো উডিফিল্ড কান এঁটো করা গ্যালগ্যালে হাসি হেসে আবার বলল, “হেঁহেঁ, সত্যি মাইরি আরাম বটে!”
একটা কাগজ-কাটা ছুরি দিয়ে ফাইনান্সিয়াল টাইমসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বস অন্যমনস্কভাবে বললেন, “হুম, ওই আর কি!” নিজের অফিসরুমটা নিয়ে বসের মনে বেশ ভালরকমেরই অহংকার ছিল। কেউ প্রশংসা করলে বস মনে মনে বেশ খুশিই হতেন। উডিফিল্ডের মাফলার জড়ানো শীর্ণ শরীরটার সামনে সাজানো গোছানো তাক লাগানো অফিসটা যেন বসের মানসিক সন্তুষ্টিরই চুড়ান্ত প্রতিফলন।
“এই ক’দিন আগে আরো একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিলাম,“ বস বললেন। ঠিক এই কথাটাই উনি শেষ কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন লোককে বলে আসছেন। টকটকে লালের ওপর সাদা সাদা চাকতি আঁকা কার্পেটটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বস বললেন, “নতুন কার্পেট”, কাঠের বিশাল বুককেস আর বেঁকানো পায়াওয়ালা টেবিলটার দিকে দেখিয়ে বললেন, “নতুন ফার্নিচার আর ওই যে নতুন ইলেকট্রিক রুম হিটার।“
শুধু টেবিলে রাখা ছবিটাকেই যেন এড়িয়ে গেলেন বস। ছবিটা একটা কমবয়সী ছেলের, ইউনিফর্ম পরে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে, ব্যাকগ্রাউন্ডের ফটোগ্রাফি স্টুডিয়োর সেই মার্কামারা মেঘলা আকাশ। ছবিটা কিন্তু নতুন নয়, বিগত ছ’বছর ধরে ঠিক ওখানেই দাঁড়িয়ে।
“কি যেন একটা তোমাকে বলতে গেলাম ভায়া,” চোখ কুঁচকে ছোট করে ভাবার চেষ্টা করলেন উডিফিল্ড, “ধুর শালা, কি বলব ভাবছিলাম ভুলে গেলাম। বেলায় যখন বেরোলাম মাথায় ছিল।“ মনে করার চেষ্টার চোটে তার হাত ফাত কাঁপতে লাগল, সাদা দাড়ির ওপরের চামড়ায় লালের ছোপ দেখা দিল।
বসের মায়া লাগল, “বুড়োটার অবস্থা একদম শেষ দিকে’” মনে মনে ভাবলেন বস। বুড়োর দিকে চেয়ে চোখ মেরে একটু মস্করার ঢঙে বস বললেন, “ওসব ছাড় তো, ঠান্ডায় বেরোনর আগে একটা জিনিস চেখে দেখ। পুরো মধু। একদম স্মুথ মাল। কচি খোকাও এক ঢোঁকে মেরে দেবে।“
ঘড়ির চেনে ঝোলান চাবিটা দিয়ে ডেস্কের নীচের দেরাজটা খুলে একটা কালোমত পেট্মোটা বোতল বার করতে করতে বস বললেন, “এইযো এইটে তোর ওষুধ। খোদ উইন্সডোর ক্যাসেলের সেলার থেকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জোগাড় করা।“
বোতলটা দেখে তো বুড়োর মুখ এক্কেবারে হাঁ। এর থেকে বস যদি জাদুকরের মত খরগোশ বার করতেন তাতেও উডিফিল্ড এত চমকাত না।
“হুইস্কি, তাই না?” ন্যাকার মত মিনমিন করে বলল বুড়ো উডিফিল্ড। বোতলটা তার দিকে ঘুরিয়ে লেবেলটা একবার দেখিয়ে দিলেন বস – হ্যাঁ, হুইস্কিই বটে।
প্রায় কাঁদোকাঁদো হয়ে বুড়ো বলল, “বাড়িতে তো এসবের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয় না আমায়।“
টেবিলের একধারে জলের বোতলের সাথে দুটো গেলাস রাখা ছিল। ওই দুটোতে হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বস বললেন, “এই কারণেই তো আমরা মেয়েদের থেকে বেশী জানি। ওরা বুঝবে এসব? নাও, ক্যোঁৎ করে গিলে ফেল দেখি। আরে না না, জল ফল দিও না। এসব জিনিসে জল-টল মেশালে ভয়ানক পাপ হয়!”
ঢক করে নিজেরটা গিলে নিয়ে, রুমালটা দিয়ে চট করে পুরুষ্টু গোঁফজোড়া মুছে নিয়ে উডিফিল্ডের দিকে চেয়ে আর একবার চোখ মারলেন বস।
হুইস্কিটা গিলে বুড়ো এক মুহূর্ত ঝিম মেরে থেকে বলে উঠল, “উফ, দারুণ!” গা হাত পা এতক্ষণে বেশ গরম হয়েছে, মদটা যেন ঠান্ডা ঝিমিয়ে পড়া বুড়ো মস্তিষ্ককে খুঁচিয়ে জাগিয়ে দিল আর সেই ভুলে যাওয়া কথাটা উডিফিল্ডের মনে পরে গেল।
চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বুড়ো বললেন, “হ্যাঁ, তা সেই কথাটা হল গিয়ে গত হপ্তায় আমার মেয়েগুলো বেলজিয়ামে গেছিল বেচারা রেজীর কবরে ফুল টুল দিতে। আর তোমার ছেলেরটাতেও সেই সুযোগে একবার ঢুঁ মেরে এল। কাছাকাছিই, দুজনের কবর বেশ কাছাকাছিই।“
উডিফিল্ড দম নিল। বস কোন উত্তর দিলেন না। বসের চোখের পাতাটা একবার কেঁপে উঠল কি?
- “মেয়েরা বলছিল যে জায়গাটা খুব সুন্দর করে রেখেছে। বেশ সাজান গোছান। এখানে থাকলে কি আর এত যত্নআত্তি পেত? তুমি একবারও যাওনি না?”
- “না, যাইনি।“ অনেক কারণ আছে বসের একবারও না যাওয়ার।
- “মাইলের পর মাইল,” বুড়ো উডিফিল্ড একঘেয়ে সুরে বলে চলল, “পুরো বাগানের মত সাজানো। সব কবরগুলোতে কি সুন্দর ফুল ফুটেছে। আর, আর কত চওড়া রাস্তা!“ উডিফিল্ডের গলা শুনে যে কেউ বলে দেবে যে ‘সুন্দর চওড়া রাস্তা’ তার কতটা পছন্দ।
একটু দম নিয়ে উডিফিল্ড আবার ঘ্যানঘ্যান করতে শুরু করল “জালিয়াতিটা তাহলে শোন ভায়া, ওখেনের হোটেলে এক শিশি জ্যামের দাম কত নিয়েছে জানো? দশ ফ্রা! অ্যাঁ! দিনে ডাকাতি একেই বলে বুঝলে ভায়া? পুঁচকে শিশি আর দাম শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। আমার মেয়ে স্রেফ এক চামচ চেখেছিল, তাতেই এই! আমার মেয়েও কম যায়না। বুঝলে ভায়া, আমার মেয়ে গোটা শিশিটাই তুলে এনেছে স্রেফ ওই হতভাগাদের শিক্ষা দেবে বলে। এ আর কিছুই না, শুধু আমাদের আবেগ নিয়ে ব্যবসা করা। আর কিছুই না। স্রেফ আবেগ নিয়ে ছেলেখেলা করা......” উডিফিল্ড পায়ে পায়ে দরজার দিকে এগোল।
“হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকাছে ঠিকাছে,” বলতে বলতে বস তাড়াহুড়ো করে নিজের ডেস্ক ছেড়ে বেরিয়ে এসে বুড়োকে দরজা অবধি এগিয়ে দিলেন। কিন্তু কি যে ঠিক আছে তা তিনি নিজেও বুঝতেও পারছিলেন না। বোঝার মত ক্ষমতায় ছিলেন না।
উডিফিল্ড বেরিয়ে যেতে অনেকক্ষণ ধরে স্থির হয়ে চোখে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন বস। অফিসের পাকাচুলো কেরানি ম্যাসেই বসের দিকে দেখতে দেখতে প্রভুভক্ত কুকুরের মত আদেশের আশায় ঘরেই এদিক ওদিক করতে লাগল।
বস বলল, “এখন কাউকে অফিসে আসতে দেবে না। আধ ঘণ্টা আমি একটু একা থাকতে চাই। বুঝলে?“
- “ঠিক আছে স্যার।“
দরজা বন্ধ হতেই ভারী পাগুলোকে লাল সাদা কার্পেটের ওপর দিয়ে কোনরকমে টেনে নিয়ে গিয়ে নিজের স্থুল দেহটাকে স্প্রিঙের চেয়ারের ওপর ছেড়ে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন তিনি। বস কাঁদতে চাইছিলেন। বসের কান্না পাচ্ছিল। কাঁদার জন্যই বস এত বন্দোবস্ত করলেন......
উডিফিল্ডের কাছে এতদিন বাদে হঠাৎ ছেলের কবরের কথা শুনে বসের মাথায় যেন আচমকা বাজ পড়ল। বস যেন দেখতে পেলেন ওনার ছেলের কবরের মাটি দু’ফাঁক হয়ে গেছে, ছেলে শুয়ে আছে আর উডিফিল্ডের মেয়েরা ওপর থেকে উঁকি মেরে দেখছে। ছ’বছর কেটে গেছে – ছ’বছর বাদেও ছেলের কবরের কথা ভাবলেই বস যেন দেখতে পান তার ছেলে শান্তভাবে ঘুমিয়ে আছে, ইউনিফর্ম পরে। একদম আগের মত, এক্টুও পরিবর্তন নেই।
“মাই সন,” বস গুঙিয়ে উঠলেন, কিন্তু চোখে জল এল না। আগে, মানে শুরুর দিকে, প্রথম মাসগুলোতে এমনকী ছেলে মারা যাওয়ার পরের কয়েক বছর ধরেও শুধু এই কথাটা উচ্চারণ করতেও তার বুক ফেটে যেত। পাগলের মত কেঁদে হয়তো একটু স্বস্তি পেতেন। তিনি তখন বলতেন যে সময় কিছুই পাল্টাতে পারে না। ওনার বক্তব্য ছিল যে অন্য কেউ হলে হয়তো সময়ের সাথে সাথে নিজেকে সামলে নেবে কিন্তু ওনার পক্ষে সম্ভব হবে না। কি করেই বা সম্ভব! ছেলেটা যে ছিল তার একমাত্র সন্তান। ছেলে জন্মানোর পর থকেই তিনি ব্যবসাটাকে দাঁড় করানোর জন্য খেটে গেছেন, শুধুমাত্র ছেলের মুখ চেয়ে; এছাড়া আর কোন উদ্দেশ্যই ছিল না। ওনার জীবনের ওই একটাই উদ্দেশ্য ছিল।
তিনি ছেলেটাকে নিজের জায়গায় দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন যেখান থেকে ব্যবসার দায়িত্ব তিনি ছেড়ে দেবেন ওনার ছেলে যেন ঠিক সেখান থেকে হাল ধরে নেয়। এটাই ছিল ওনার স্বপ্ন।
আর সেই স্বপ্ন প্রায় সত্যিও হতে চলেছিল। যুদ্ধের আগে বছরখানেক ধরে ছেলে নিয়মিত অফিসে আসছিল। কাজও দারুণ শিখছিল। প্রতিদিন সকালে একই সাথে দুজনে ট্রেনে করে আসতেন, আবার ফিরেও যেতেন একই সাথে। লোকজন কি তারিফই না করত! স্টাফেরাও সবাই ভালবাসত, এত সুন্দর স্বভাবের ছেলে যে সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সবার সাথেই খুব ভাল ব্যবহার করত আর বাচ্ছা বাচ্ছা উজ্জ্বল মুখটায় সবসময় একটা কথা লেগেই থাকত, “ওহ! দুর্দান্ত!”
কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল, এমনভাবেই শেষ হয়ে গেল যেন সত্যি কোনদিন কিছু ছিলই না। যেদিন ম্যাসেই ওনার হাতে টেলিগ্রামটা তুলে দিয়েছিল সেদিন যেন একটা এরোপ্লেন বসের মাথায় ভেঙে পড়েছিল, “আপনাকে অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানানো হচ্ছে যে......” জীবনটা সেদিনই ছারখার হয়ে গিয়েছিল বসের।
ছ’বছর আগে...... ছ’বছর! কত তাড়াতাড়ি যে সময় যায়! ভাবলে মনে হয় যেন এই তো গতকালের ঘটনা। বস মুখ থেকে হাত সরালেন। মাথা কাজ করছিল না। ওনার মনের ভেতরে কিছু একটা যেন ঠিক নেই। ঠিক যেমনটা অনুভব করার কথা তেমনটা যেন তিনি অনুভব করতে পারছেন না। বস একবার ছেলের ছবিটা দেখবেন বলে ডেস্ক ছেড়ে উঠলেন। ছবিটা তার মোটেও পছন্দের না, এরম ঠান্ডা কঠোর দৃষ্টি তার ছেলের কখনই হতে পারে না। সে এরম ছিলই না।


হঠাৎ বসের চোখে পড়ল টেবিলের বড় মুখওয়ালা কালির পাত্রের মধ্যে একটা মাছি পড়ে খুব দুর্বল কিন্তু মরিয়াভাবে হাত পা ছুঁড়ছে। দোয়াতের গা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু হলে কি হবে? দোয়াতের গা এতটাই পিচ্ছিল যে মাছিটা বারবার হড়কে কালিতে পড়ে যাচ্ছে আর হাবুডূবু খাচ্ছে। বস একটা পেন নিয়ে মাছিটাকে কালি থেকে তুলে একটা ব্লটিং কাগজের ওপর ঝেড়ে ফেললেন। কয়েকমূহুর্তের জন্য মাছিটা স্থির হয়ে কাগজের কালো ছোপটার ওপর শুয়ে রইল। ব্লটিং পেপার আসতে আসতে কালি শুষে নিতে থাকল আর মাছিটাও ধীরে ধীরে সামনের পায়ের ওপর ভর দিয়ে ক্লান্ত শরীরটাকে তুলে ধরল। তারপর শুরু হল ডানা থেকে কালি পরিস্কার করার ক্লান্তিকর কাজ। পাথরের ওপর কাস্তে শান দেওয়ার মত করে সামনের পাগুলোকে ডানার ওপর নিচ, ওপর নিচ করে চালাতে লাগল। তারপর অনেক চেষ্টা করে মাছিটা একটা ডানা মেলল, তারপর আরেকটা। তারপর সোজা হয়ে বসে ঠিক বেড়ালের মত সামনের পাদুটোকে দিয়ে মুখ পরিস্কার করে বেশ খুশি হয়েই সামনের দুটো পা মুখের সামনে ঘষতে লাগল। উফফ! একটা সাংঘাতিক বিপদের হাত থেকে বাঁচা গেল বটে। বিপদ থেকে পালিয়ে আবার সে জীবনের জন্য প্রস্তুত।
ঠিক তক্ষুনি বসের মাথায় একতা আইডিয়া এল। পেনটা আবার কালিতে ডোবালেন। ব্লটিং কাগজের ওপর কব্জির ভর দিয়ে অপেক্ষা করে রইলেন। ঠিক মাছিরটা যখন উড়তে যাবে ওপর থেকে একটা ভারী কালির ফোঁটা ওই ছোট্ট শরীরটার ওপর নেমে এল। দেখি এবার কি করে মাছিটা। এবার? মাছিটা ভয়ে বিস্ময়ে এতটাই বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল যে কিছুক্ষণ নড়তেই পারল না। তারপর, খুব কষ্ট করে শরীরটাকে সামনের দিকে হিঁচড়ে নিয়ে চলল। সামনের পাগুলো আবার নড়তে শুরু করল, আবার পরিস্কার হওয়ার পালা। আগের থেকে অনেক আস্তে হলেও মাছিটা কিন্তু থামল না, আবার প্রথম থেকে শুরু করল।
বাহ! মালটার দম আছে তো বেশ, মনে মনে ভাবলেন বস। বসের মনে মাছিটার জন্য বেশ সম্ভ্রম জাগল। এই তো, এইভাবেই যেকোন পরিস্থিতিকে সামলাতে হয়। হাল ছাড়ে কাপুরুষে, হাল ছাড়তে নেই কখনো কিন্তু...... মাছিটা আবার কষ্টকর কাজটা শেষ করে ফেলেছে। বসও পেনে কালি ভরতে দেরি করলেন না, অতিকষ্টে পরিস্কার করা শরীরটার ওপর আরেকটা কালো ফোঁটা এসে পড়ল। এবার? এবার? বেশ কিছুক্ষণের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা। আবার সামনের পাগুলো ধীরে ধীরে নড়তে শুরু করল, - স্বস্তির শ্বাস ফেলে মাছিটার ওপর ঝুঁকে পড়ে বস বললেন, “জিও শালা হা......” আরো একটা চরম আইডিয়া তার মাথায় এল। মাছিটার ওপর তিনি হালকা হালকা নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন যাতে কালিটা আর তাড়াতাড়ি শুকোয়, কিন্তু মাছিটার নড়াচড়া বড্ড স্লথ হয়ে এসেছিল। বস স্থির করলেন যে এটাই শেষবার। পেনটাকে দোয়াতে অনেকটা ডোবালেন।
হ্যাঁ, মাছিটার অবস্থা সত্যিই শেষ হয়ে এসেছিল। শেষ ফোঁটাটা নেমে আসতে মাছিটা আর নড়ল না। পেছনের পাগুলো ছোট্ট শরীরটার সাথে একদম আটকে গেছে, আর সামনের পাগুলো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।
“এই চল” বস উত্তেজিতভাবে বললেন, “ওঠ। ওঠ। পারবি তুই।“ পেনটা দিয়ে মাছিতাকে কয়েকবার নাড়ালেন বস। কিছুই হল না। কিছু হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। মাছিটা ততক্ষণে মরে গিয়েছিল।
কাগজ-কাটা ছুরিটার ডগা দিয়ে মাছির লাশটা তুলে নিয়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ছুঁড়ে দিলেন বস। হঠাৎ একটা চাপা আতঙ্কে বসের দম বন্ধ হয়ে এল, মনে হল যেন তিনি কোথাও একটা তলিয়ে যাচ্ছেন। তাড়াতাড়ি করে টেবিলের ঘন্টাটা বাজিয়ে তিনি ম্যাসেইকে ডাকলেন।
ম্যাসেই আসতে বস গম্ভীরভাবে বললেন, “ক’টা ফ্রেশ ব্লটিং পেপার এনে দাও তো। আর তাড়াতাড়ি।“ বুড়ো কুকুরটা নিঃশব্দে বেরিয়ে যেতে সোজা হয়ে বসলেন বস। কি যেন ভাবছিলেন তিনি? আরে একটু আগেই কি যেন একটা ভাবছিলেন! কি বেশ? রুমালটা দিয়ে ঘাড়ে জমা ঘাম মুছলেন বস। প্রচন্ড চেষ্টা করেও তিনি কিছুতেই মনে করতে পারলেন না।     
 [Follow Nirban on Facebook]
____________________
এই গল্পটায় যদি তথাকথিত টানটান কোন ক্লাইম্যাক্স আশা করেন তাহলে ভুল করবেন। 'তারপর সে গাঁক করে পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিল', 'ভূতে এসে ঘাড় মটকে দিল', 'মেয়েটার শোকে ছেলেটা আত্মহত্যা করল' ইত্যাদি কোন ড্রামাটিক এন্ডিং না থাকলে অনেকে মনে করেন এ আবার কি লেখা! যদি সেরম মনে হয় ফিল ফ্রী টু আস্ক। পুরোটা এক্সপ্লেইন করেও একটা আলোচনা পোস্ট করতে পারি তাদের সুবিধার্থে।

Tuesday, 17 November 2015

The Death of a Government Clerk

।।একটি সরকারী কেরানির অপমৃত্যু।।
                                                     - আন্টন চেকভ 
একটি সুন্দর সন্ধ্যায় ইভান দিমিত্রিচ চেরভিয়াকভ নামে একজন নিপাট ভদ্রলোক সরকারী কেরানি অপেরাতে বসেছিলেন - দ্বিতীয় সারিতে। চোখে অপেরা গ্লাস লাগিয়ে একমনে তিনি 'ক্লচেশ ডি কর্নভিল' দেখছিলেন। যত দেখছিলেন তার মন তত প্রশান্তিতে ভরে উঠছিল।
কিন্তু হঠাৎ, - সাহিত্যের অনুগামীরা এই 'কিন্তু হঠাৎ' শব্দটার সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত - সাহিত্যিকরা ঠিকই বলেন - জীবন অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ।
যাই হোক গল্পে ফেরা যাক। তো হঠাৎ তার মুখ কুঁচকে বিকৃত হয়ে উঠলো, চোখগুলো ছোট হয়ে এলো, সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে তিনি আওয়াজ ছাড়লেন: 'হ্যাঁচ্চো....!!'  হ্যাঁ আপনারা ঠিকই বুঝেছেন - তিনি হাঁচলেন।
হাঁচাটা কোন নিন্দনীয় অপরাধ হিসাবে ধরা হয়ে থাকে না - চাষিরাও হাঁচে, পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্টও হাঁচেন, এমনকী মন্ত্রীরাও কখনো সখনো হেঁচে থাকেন। মানুষ মাত্রই হাঁচতে বাধ্য। অতএব চেরভিয়াকভ বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছে নিলেন আর ভদ্রলোকের মত চারদিকে চেয়ে একবার দেখে নিলেন যে তার হাঁচিতে কেউ বিরক্ত হয়েছেন কি না।
কিন্তু যা দেখলেন তাতে তিনি বেশ বিচলিত হয়ে পরলেন। তিনি দেখলেন তার সামনে মানে প্রথম সারিতে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসে গ্লাভস পরা হাত দিয়ে ভালোভাবে নিজের টাকটি পরিস্কার করছেন ও বিড়বিড় করে কিছু আওড়াচ্ছেন। চেরভিয়াকভ চিনতে পারলেন যে ওই বয়স্ক ভদ্রলোকটি হলেন পরিবহন দপ্তরের একজন সিভিলিয়ান জেনেরাল যার নাম ব্রিজালভ।
'এ বাবা! আমি কি করলাম!' চেরভিয়াকভ ভাবলেন, 'এনার গায়ে আমি হেঁচে ফেললাম! যদিও ইনি আমার ডিপার্টমেন্ট এর প্রধাণ না, তাও বড় মাপের একজন সরকারি অফিসার তো বটে। আমাকে ক্ষমা চাইতেই হবে।'
চেরভিয়াকভ একবার গলা খাঁকরে নিলেন। নিজের পুরো শরীরটাকে সামনে ঝুঁকিয়ে জেনেরালের কানে ফিসফিস করে বললেন, 'ক্ষমা করবেন হুজুর। ভুল করে আপনার গায়ে হেঁচে ফেলেছি।'
- 'না না ঠিক আছে।'
- 'একটু বোঝার চেষ্টা করুন হুজুর। আ - আমি - আমি ইচ্ছা করে করিনি।'
- 'উফ! আপনি দয়া করে বসুন। আমাকে শুনতে দিন।'
চেরভিয়াকভ লজ্জিত হয়ে নিজের সিটে বসে স্টেজের দিকে তাকালেন; কিন্তু কিছুক্ষন পর বুঝলেন যে তিনি আর অনুষ্ঠানটি উপভোগ করতে পারছেন না। তার প্রচন্ড অস্বস্তি হতে লাগল।
ইন্টারভ্যাল হতেই তিনি সিট ছেড়ে উঠে গিয়ে সোজা ব্রিজালভ এর পাশে দাঁড়ালেন। লজ্জা কাটিয়ে কোনরকমে বিড়বিড়িয়ে বললেন, 'আপনার গায়ে ভুল করে থুতু ছিটকে ফেলেছি হুজুর। অপরাধ নেবেন না - আমি কিন্তু ইচ্ছা করে করিনি। আসলে -'
মাঝপথে তাকে থামিয়ে দিয়ে অধৈর্য্য ভাবে ব্রিজালভ বললেন, 'আরে যথেষ্ট হয়েছে। আমি কিছু মনে করিনি। পরের বার থেকে খেয়াল রাখবেন আপনি।'
'বলছে ক্ষমা করে দিয়েছে। তাও কেন জানি না লোকটার চোখে আমি শয়তানির আগুন দেখতে পাচ্ছি', চেরভিয়াকভ সন্দেহের চোখে জেনেরাল এর দিকে চেয়ে রইল, 'লোকটা আমার সাথে কথা বলতে চাইছে না - কিন্তু আমাকে বোঝাতেই হবে। আমাকে বোঝাতেই হবে যে এটা আমি ইচ্ছা করে করিনি। নইলে লোকটা এখন না ভাবুক পরে ভাবতেই পারে যে আমি ইচ্ছা করে করেছি - এটাই প্রকৃতির নিয়ম।'
বাড়ি ফিরে চেরভিয়াকভ নিজের স্ত্রীকে সব বললেন। প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও তার স্ত্রী যখন জানলেন যে তিনি অন্য ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। ঘটনাটাকে তার স্ত্রী যে এত হালকা ভাবে নিল সেটা চেরভিয়াকভের পছন্দ হল না।
-'যাই হোক ক্ষমা চাওয়াতেই মংগল। নয়তো উনি আবার ভাববেন তুমি জান না কিভাবে সমাজে ব্যবহার করতে হয়।'
-'আরে সেটাই তো হচ্ছে ব্যাপার! আমি ক্ষমা চেয়েছি কিন্তু উনি খুব অদ্ভুতভাবে ব্যবহার করলেন! তিনি ঠিকঠাক কথা একবারও বললেন না। ওখানে বেশী কথা বলার সুযোগও পেলাম না।'
পরের দিন চেরভিয়াকভ নতুন একটা ইউনিফর্ম পরে, চুল কেটে, ব্রিজালভের অফিসে চললেন। জেনেরালের অফিসে গিয়ে দেখলেন যে কয়েকজন পিটিশনারদের মাঝে জেনেরাল বসে আছেন আর তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন। কিছুক্ষণ পর জেনেরাল তার দিকে মুখ তুলে তাকালেন।
চেরভিয়াকভ শুরু করল, 'গতকাল আর্কেডিয়াতে - যদি আপনার মনে থাকে হুজুর - মানে আমি ওই ভুল করে হেঁচে ফেলেছিলাম। আপনার গায়ে থুতু পরেছিল; কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি ইচ্ছা করে -'
- 'আরে কি পাগলামি এটা! কোন মানে হয় নাকি!' জেনেরাল বললেন।
তারপর তিনি অন্যদিকে ঘুরে একজন পিটিশনারের সাথে কথা বলতে লাগলেন।
'তিনি আমার সাথে কথা বলবেন না। তার মানে তিনি এখনো রেগে আছেন!' চেরভিয়াকভ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। 'না না, এরম ভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না। ওনাকে আমি বুঝিয়ে ছাড়ব।'
তিনি আবার জেনেরালের দিকে এগিয়ে গিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বললেন, 'হুজুর সত্যি বলছি আমি ইচ্ছা করে করিনি। মন থেকে ক্ষমা চাইছি আমি - সত্যি বলছি স্যার।'
-'আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন? ' বিরক্তিতে মুখ বিকৃত করেরে বললেন জেনেরাল আর দরজাটা চেরভিয়াকভের সামনে বন্ধ করে দিলেন।
'মজা কখন করলাম আমি!' চেরভিয়াকভ আশ্চর্য হয়ে ভাবলেন, 'এরম আমি ভাবিইনি। একজন জেনেরালের সাথে কিভাবে আমি মজা করতে পারি! ধুর উনি বুঝবেন না। তাই যদি হয় আমি আর ক্ষমা চাইব না। এবার আমি ওনাকে চিঠি লিখব। কিন্তু জোভের দিব্যি আমি আর যাব না।'
এই ভেবে চেরভিয়াকভ বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন। কিন্তু চিঠি লেখা আর হল কই! লিখতে বসে ভাবতে লাগলেন, ভাবতে লাগলেন কিন্তু কি লিখবেন কিছু ভেবে পেলেন না। পরের দিন তিনি আবার জেনেরালের সাথে দেখা করার জন্য বেরোলেন।
'হুজুর আগের দিন বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।' জেনেরাল মুখ তুলে তাকাতে আবার চেরভিয়াকভ বলতে শুরু করল, 'আমি মজা করিনি সত্যি বলছি। যেদিন ইচ্ছা করে হাঁচিনি, থুতুও দিইনি। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনার সাথে মজা করার কথা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি না। আপনার মত লোকের ব্যাপারে মজা করার কথা যদি কেউ ভাবে তাহলে তার মত অন্যায় কিছু হতে পারে না -'
'দূর হয়ে যা!' - রাগে লাল হয়ে চিৎকার করে উঠলেন জেনেরাল, থরথর করে কাঁপতে লাগলেন জেনেরাল।
'কি!' - ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে ফ্যাশফ্যাশে স্বরে বলে উঠলেন চেরভিয়াকভ।
মেঝেতে পা ঠুকে চিৎকার করে উঠলেন জেনেরাল, 'বেরিয়ে যা এক্ষুনি!'
চেরভিয়াকভের পেটের ভেতরটা কেমন করে উঠল। তার চারদিকে অন্ধকার নেমে এল - টলতে টলতে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন  চেরভিয়াকভ। রাস্তায় বেরিয়ে টলতে টলতে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন তিনি। যন্ত্রের মত বাড়ি ফিরে এসে ইউনিফর্ম না খুলেই সোফার উপর ভেঙে পরলেন তিনি শেষ নিশ্বাস ছাড়ার আগে।

Saturday, 10 October 2015

The Night Train at Deoli (Bengali)

দেওলিতে রাতের ট্রেন 
                                         রাস্কিন বন্ড 
যখন আমি কলেজে পড়তাম তখন গরমের ছুটিগুলো কাটাতাম আমার ঠাকুমার কাছে দেহরাতে। মোটামুটি মে মাসের প্রথম দিক করে আমি সমতল ছেড়ে যেতাম আর জুলাই এর শেষদিকে ফিরে আসতাম। দেহরা থেকে ত্রিশ মাইল মত দূরে দেওলি নামে একটা ছোট্ট স্টেশন ছিলো; সেখান থেকেই ভারতীয় তরাইয়ের ঘন জংগল শুরু হয়ে যেত।
ভোর পাঁচটা নাগাদ যখন ট্রেনটা দেওলিতে এসে থামত, টিমটিম করে জ্বলতে থাকা ইলেক্ট্রিক বাল্ব আর তেলের বাতিতে স্টেশনটা দেখা যেত। রেলট্র‍্যাক পেরিয়ে উলটোদিকের জংগলটা ভোরের আবছা আলোতে মায়াময় দেখাত। দেওলিতে মোটে একটা প্ল্যাটফর্ম ছিল, স্টেশনমাস্টারের জন্য ছিল একটা অফিস আর একটা ওয়েটিংরুম। প্ল্যাটফর্ম এ থাকার মধ্যে ছিল একটা চায়ের দোকান, একজন ফলওয়ালা আর দু-চারটে ফেতি কুকুর; বেশী কিছু ওখানে কখনই দেখতে পাইনি, কারণ ট্রেনটা সেখানে মিনিট দশেক থেমে থেকেই ঘন জংগলের দিকে ছুটতে শুরু করত।

কেন যে আদৌ ট্রেনটা দেওলিতে থামত আমার জানা নেই। ওখানে কক্ষনো কিচ্ছু হত না। কেউ ট্রেনে উঠত না বা নামত না। প্ল্যাটফর্মটাতে কোনদিনো আমি একটা কুলি অবধি দেখিনি। কিন্তু ট্রেনটা পুরো দশ মিনিট সেখানে থেমে থাকত, তারপর একটা ঘন্টা বাজত, ট্রেনের গার্ড তার বাঁশিতে ফুঁ দিত; তারপর দেওলি আবার পিছনে পড়ে থাকত বিস্মৃতির রাজ্যে।
আমি সবসময় ভাবতাম যে দেওলির ওই স্টেশনের পাঁচিলের বাইরে কি হয়। আমার সবসময় মন কেমন করত ওই একলা ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম আর জায়গাটার জন্য যেখানে কেউ আসতে চায় না। আমি স্থির করেছিলাম যে, একদিন ঠিক আমি দেওলিতে নামব আর পুরো একটা দিন কাটাব, শুধুমাত্র মফস্বলটাকে খুশি করার জন্য।
তখন আমি আঠেরো, ঠাকুমার কাছে যাচ্ছি, আর যথারীতি দেওলিতে রাত্তিরের ট্রেনটা এসে থামল। প্ল্যাটফর্ম দিয়ে একটা মেয়ে ঝুড়ি বিক্রি করতে করতে আসছিলো।
সকালের ওই ঠান্ডাতেও মেয়েটির কাঁধে শুধুমাত্র একটা শাল ফেলা ছিল। খালি পা, পুরোন জামা-কাপড় আর কমবয়সী একটি মেয়ে - চলার মধ্যে পরিস্কার মাধুর্য আর আত্মসম্মানের ছাপ।
আমার কামরার সামনে এসে মেয়েটি থেমে গেল। বুঝতে পারল যে আমি তার দিকে জেনেশুনে একভাবে তাকিয়ে আছি; না দেখতে পাওয়ার ভান করল সে। তার ত্বক ছিলো ফ্যাকাশে আর চুল উজ্বল কালো, চোখগুলো গভীর ও কিছুটা উদ্বিগ্ন। তারপর তার চঞ্চল চোখের সাথে আমার চোখাচোখি হল।
কিছুক্ষন সে থেমে রইল আমার জানলার পাশে, দুজনের কারো মুখ দিয়ে একটিও কথা বেরোল না। যখন মেয়েটা চলে যাবার জন্য পা বাড়াল আমি তাড়াতাড়ি করে সিট ছেড়ে কামরার দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। অন্যদিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। তারপর চায়ের দোকানটার দিকে এগিয়ে গেলাম। আগুনের ওপর একটা কেটলি ফুটছে চোখে পড়ল, কিন্তু দোকানিকে দেখতে পেলাম না: হয়ত ব্যস্ত তখন ট্রেনের কামরার কোথাও চা বিলি করতে। মেয়েটাও চায়ের দোকানের পিছনে আমার কাছে এসে থামল।
'ঝুড়ি কিনবেন একটা? খুব শক্তপোক্ত, খুব ভালো বেত দিয়ে বানানো --' মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো।
'না', বললাম আমি, 'ঝুড়ি আমার চাই না।'
আমরা থমকে রইলাম একে অপরের দিকে তাকিয়ে: মনে হল যেন দীর্ঘ সময় ধরে, শেষে মেয়েটি বললল, 'সত্যি আপনার লাগবে না ঝুড়ি?'
'ঠিক আছে, একটা দাও,' বলে সবার উপরের ঝুড়িটা তুলে নিয়ে তাকে একটা টাকা দিলাম, কোনরকমে তার আঙুল স্পর্শ করার আস্পর্ধা দেখিয়ে।
সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় হঠাত গার্ডের বাঁশি বেজে উঠল; সে কিছু বলল কিন্তু ঘন্টার আওয়াজ আর ইঞ্জিনের হিসহিস শব্দে তার কথা চাপা পরে গেল। আমি বাধ্য হলাম আমার কামরার দিকে ছুটতে। আমি ওঠার সাথে সাথেই ট্রেনটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল।
প্ল্যাটফর্মটা পিছন দিকে সরে যেতে থাকল আর আমি মেয়েটার দিকে একভাবে তাকিয়ে রইলাম। প্ল্যাটফর্ম  মাঝে একা থমকে সেই মেয়েটি - আর কেউ নেই; সে সেখান থেকে নড়লো না। তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। তার মুখে হাসি ফুটে উঠতে দেখলাম। তার দিক থেকে চোখ সরাতে পারলাম না যতক্ষণ না একটা সিগনাল বক্স এসে মেয়েটিকে ঢেকে দিল; তারপর তরাইয়ের ঘন জংগল সম্পূর্ণভাবে স্টেশনটির উপর পর্দা ফেলে দিল। আমি কিন্তু তখনো দেখতে পাচ্ছিলাম মেয়েটাকে আমার চোখের সামনে।
বাকি পথটা আমি জেগে বসে কাটিয়ে দিলাম। আমি কিছুতেই আমার মাথা থেকে মেয়েটার মুখ আর সেই মায়াবী চোখদুটো সরাতে পারলাম না।
কিন্তু দেহরাতে গিয়ে আমি এত কিছুতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম যে সেই ঘটনাটা ঝাপসা আর প্রায় বিস্মৃত হতে বেশী সময় লাগলো না। তবে মাস দুই বাদে আমি যখন ফিরে যাচ্ছিলাম তখন আবার মেয়েটিকে মনে পড়ল।
যখন ট্রেনটা দেওলিতে ঢুকলো আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকেই খুজছিলাম আর হঠাৎ তাকেই প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হাটতে দেখে চমকে উঠলাম। আমি ছুটে গিয়ে কামরার পাদানিতে দাঁড়িয়ে তার দিকে হাত নাড়লাম।
আমাকে দেখতে পেয়ে সে হাসলো। তাকে আমি ঠিক মনে রেখেছি দেখে সে বেশ খুশি হল আর আমি খুশি হলাম সে আমাকে মনে রেখেছে দেখে। আমরা দুজনেই খুশি হলাম - পুরনো বন্ধুকে দেখে খুশি হওয়ার মত।
সে ঝুড়ি নিয়ে ট্রেনের জানলায় জানলায় না গিয়ে সোজা চায়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালো; গভীর চোখ দুটোতে হঠাত আশার উজ্জ্বল আলো দেখতে পেলাম। কিছুক্ষণ দুজনেই কোন কথা বললাম না - বলতে চাইলেও বলার মত বিশেষ কিছু ছিল না। অধৈর্যের মত খালি ভাবতে লাগলাম যে ওকে আমার সাথে ট্রেনে করে নিয়ে চলে যাই। প্রত্যন্ত দেওলি স্টেশনের মতই ও যে একটু পরেই আমার থেকে দূরে সরে যাবে এটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। তার হাত থেকে ঝুড়িগুলো নিয়ে আমি মাটিতে নামিয়ে রাখলাম। সে একটা ঝুড়ির দিকে হাত বাড়াতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই আমি তার হাত চেপে ধরলাম।

'আমাকে দিল্লি যেতে হবে।' আমি বললাম।
সে মাথা নেড়ে বলল, 'আমাকে এখানেই থাকতে হবে।'
  গার্ড তার বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে ট্রেন ছাড়ার সংকেত দিল - এটার জন্য সেই মূহুর্তে গার্ডের উপর আমার প্রচন্ড রাগ হল।
'আমি আবার আসব', আমি বললাম, 'তুমি কি এখানেই থাকবে?'
সে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল, ঘন্টা বাজল আর ট্রেন এবার চলতে শুরু করল। আমি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ট্রেনের দিকে ছুটতে বাধ্য হলাম।
এবার আর তাকে ভুলতে পারলাম না। বাকি পথ ধরে আমি শুধু তার কথাই ভাবতে লাগলাম, সেই ভাবনা এবার অনেক দিন স্থায়ী হল। পুরো বছরটা ধরেই আমাকে ঘিরে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি অনুভব করলাম। এবার কলেজের ছুটি পরতেই তাড়াহুড়ো করে গোছগাছ সেরে দেহরার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম - অন্যান্য বারের থেকে তাড়াতাড়ি। ভাবলাম ঠাকুমা বেশ খুশি হবে তার সাথে দেখা করার জন্য নাতির টান দেখে।
ট্রেন যত দেওলির দিকে এগোচ্ছিল আমি তত বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলাম - ভাবছিলাম মেয়েটার সাথে দেখা হলে কি বলব। আগের দু'বার ওর সামনে হতভম্বের মত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারিনি। এবার আমি ভেবেই নিয়েছিলাম যে ওকে আমি মনের কথা বলবই।
ট্রেন দেওলিতে এসে থামল। আমি প্ল্যাটফর্ম এর এদিক ওদিক দেখলাম কিন্তু তাকে কোথাও দেখতে পেলাম না।
আমি দরজা খুলে নেমে পড়লাম। প্রচন্ড হতাশ লাগছিল আর একটা বাজে কিছুর আশঙ্কাতে মনটা খচখচ করতে লাগল। আমি ভাবলাম যে একটা কিছু আমাকে করতেই হবে। আমি স্টেশন মাস্টারের কাছে ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'এখানে যে মেয়েটা ঝুড়ি বেচত তাকে চেনেন?'
'না চিনি না', 'আর তুমি এখানে আটকে পরতে না চাইলে এক্ষুনি গিয়ে ট্রেনে ওঠো।'
আমি হন্তদন্ত হয়ে স্টেশনে এদিক ওদিক পায়চারি করতে শুরু করলাম, স্টেশনের রেলিং এর উপরর দিয়ে দেখলাম; দেখলাম শুধু একটা আম গাছ আর একটা ধুলোমাখা রাস্তা চোখে পড়ল - রাস্তাটা চলে গেছে একটা বনের মধ্যে।
কোথায় গেছে এই রাস্তাটা? - কথাটা ভাবতে ভাবতে খেয়াল করলাম যে ট্রেন চলতে শুরু করেছে; আমি ছুটে গিয়ে লাফিয়ে কামরায় উঠলাম। ট্রেন দ্রুত বেগে ঘন অরণ্যের মধ্যে দিয়ে ছুটতে শুরু করলো আর আমি জানলার ধারে বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন হলাম।
এমন একটা মেয়েকে কীভাবে খুঁজে বার করা সম্ভব যাকে আমি মাত্র দু'বার দেখেছি, কথা তো বলিনি বললেই চলে, আর যার ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না - একদম কিছুই না। কিন্তু ওর জন্য আমার মনে একটা অদ্ভুত দুর্বলতা আর দায়িত্ববোধ তৈরি হয়েছিল যেমনটা আমি আগে কক্ষনো অনুভব করিনি।
ঠাকুমা আমার উপর একদমই খুশি হল না কারণ এবার আমি মোটে সপ্তা'দুয়েক ঠাকুমার কাছে থেকেই বেরিয়ে পরলাম। যে ক'দিন ছিলাম তখনো অস্থির আর অন্যমনস্ক থাকতাম। অতএব আমি সমতলে ফেরার ট্রেন ধরলাম - উদ্দেশ্য ছিল সে স্টেশন মাস্টারের সাথে দেখা করে মেয়েটির ব্যাপারে আরো খবর সংগ্রহ করা।
সেখানে এসে দেখলাম নতুন একজন স্টেশনমাস্টার দেওলি স্টেশনের দায়িত্ব নিয়েছেন - আগের স্টেশনমাস্টার গত সপ্তাহে বদলি নিয়ে চলে গেছেন। নতুন স্টেশনমাস্টার দেখলাম ঝুড়ি বিক্রি করে এমন কোন মেয়ের ব্যাপারে কিছুই জানেন না। আমি বাধ্য হয়ে এবার গেলাম চায়ের দোকানির কাছে। চায়ের দোকানি দেখলাম একজন শীর্ণ, ছোট্টখাট্টো, ময়লা কাপড় পরা মানুষ। তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে ঝুড়ি নিয়ে যে মেয়েটা আসত তার ব্যাপারে সে কিছু জানে কি না।
'আসত বটে একটা মেয়ে ঝুড়ি নিয়ে, বেশ মনে আছে আমার।' দোকানী বলল, 'কিন্তু সে তো আর আসে না।'
'কেন?' বললাম আমি, 'আসেনা কেন?'
'আমি কি করে জানব?' উত্তর পেলাম, 'ও আমার কে হয় যে জানব?'
আমাকে আবার ছুটতে হল ট্রেনের দিকে।
তবে আমি ট্রেনে যেতে যেতে স্থির করলাম যে দেওলিতে আমি এসে একদিনের জন্য থাকব, লোকালয়ে খবর নেওয়ার চেষ্টা করব সেই মেয়েটার ব্যাপারে, যে তার গভীর চোখের জাদুতে আমাকে বশ করেছে।
এটা ভেবেই আমি নিজেকে কলেজের শেষ বছরটা সান্ত্বনা দিয়ে রাখলাম। আমি গরমকালে আবার দেহরার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, ভোরবেলা ট্রেনটা যখন দেওলি এল আবার আমি তন্নতন্ন করে তাকে খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না। তাতেও আমি আশা ছাড়লাম না।
কেন জানিনা, দেওলিতে আমি একদিনের জন্য থাকব স্থির করেও থাকতে পারলাম না। (আমার মনে হল যে ওখানে থেকে মেয়েটিকে খুঁজে বার করে একটা ভালো সমাপ্তি রচনা করা শুধু সিনেমা বা উপন্যাসেই সম্ভব।) আমার মনে হয় আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম। মেয়েটি কি অবস্থাতে আছে সেটা জানার সাহস আমার ছিল না। হয়ত সে আর দেওলিতে থাকতত না, হয়ত তার বিয়ে হয়ে গেছিল বা হয়ত সে অসুস্থ হয়ে..........
শেষ কয়েক বছরেও আমি দেওলি স্টেশনের উপর দিয়ে বেশ কয়েকবার যাতায়াত করেছি। যতবারই গেছি ততবারই জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাকে খোঁজার চেষ্টা করেছি। প্রতিবারই হয়ত একটু হলেও আশা রেখেছি সেই হাসিমুখটাকে দেখতে পাওয়ার। আমি মাঝেমাঝে ভাবি যে দেওলিতে কি হয় - স্টেশনের ওই পাঁচিলের বাইরে কি আছে। কিন্তু আমি জানি যে আমি কখনই দেওলিতে থেমে সেখানে থাকব না। এটা করলে আমার খেলাটাই ভেস্তে যাবে। কারণ আমি পছন্দ করি আশা করতে আর স্বপ্ন দেখতে, খালি প্ল্যাটফর্মটাকে জানলা দিয়ে দেখতে আর তাকে খুঁজতে, আশা করতে যে ওকে দেখতে পাব ঝুড়ি নিয়ে এগিয়ে আসতে।
আমি দেওলিতে আর কক্ষনো নামি না, কিন্তু চেষ্টা করি যতবার সম্ভব ওখান দিয়ে ট্রেনে করে যাওয়ার।।