Monday, 2 October 2017

।।তৃষ্ণা।।

।।তৃষ্ণা।। নির্বাণ


(ঘরের আলো নিভিয়ে পড়ার অনুরোধ রইল।)                                                                      ছবি: ইন্টারনেট। 

আমাদের বাড়িটা শহরের একপ্রান্তে। দুর্গাপুজোর ছোঁয়া বাড়ি অবধি এসে পৌঁছয় না। পুরনো কলকাতার আলো আঁধারি গলিঘুঁজির গোলকধাঁধায় চলতে চলতে হঠাৎই এসে ঠোক্কর খেতে হয় আমাদের সিংহদুয়ারে। স্যাঁতস্যাঁতে শ্যাওলাধরা বাড়িগুলো নিজেদের মধ্যে এত ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে যে পারলে সূর্যের আলোটাও শুষে নেয়। রাস্তার দুধারে কাঁচা ড্রেন থেকে দুর্গন্ধ ওঠে। বিকেল হতেই শুরু হয়ে যায় মশাদের ঘ্যানঘ্যানানি। গলিপথ দিয়ে মিনিট দেড়েক হাঁটলেই অবশ্য চওড়া রাস্তায় এসে পড়া যায়। খুব বড় না হলেও একটা পুজো সেখানে হয়। মধ্যবিত্ত বাঙালি পাড়ার প্রায় উঠে যেতে বসা একটা ক্লাব, সাধারণ লাল কাপড়ের প্যান্ডেল, পাড়ারই কচিকাঁচা, ছেলেপুলে, মেয়েবউদের খানিক জমায়েত। তবে আলোর ব্যাপারে কার্পণ্য করে না এ পাড়ার লোকজন। পুরনো বাড়িগুলোয় ছাদ থেকে পর পর ঝোলানো হয় হলদে চেন লাইট। এছাড়া পোস্টে পোস্টে চন্দননগরের লাল নীল নকশাদার নিওন আলো। খুব বেশী জায়গা জুড়ে না হলেও খুব সুন্দর করে সাজানো হয় পাড়াটাকে। হয়তো সারাবছর আমাদের পাড়াটায় আলোর খুব অভাব বলেই সবার একটা বাড়তি তাগিদ থাকে এই পাঁচটা দিন আলোর শেষ বিন্দুটুকুও তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে নেওয়ার।

এবারেও পঞ্চমীর রাতে ভ্যান রিক্সায় চাপিয়ে কুমোরটুলি থেকে হইহই করে ঠাকুর আনা হল। পাড়ার বউরা শাঁখ বাজাল - কাঁসরঘণ্টার ঠ্যাংঠ্যাঠ্যাং ঠ্যাং আওয়াজ। একচালা ঠাকুর। মায়ের মুখটা ভারী মিষ্টি।

সেদিনই আমার কলেজে ছুটি পড়েছিল। সন্ধের দিকে আমাদের সরু গলির মুখে দাঁড়িয়ে আমি, মা, সরকার দাদু, আর আমাদের দারোয়ান রাম সিং ঠাকুর আনা দেখেছিলাম। আমাদের উপস্থিতি কিছুটা প্যাসিভ। হইচইতে আমরা সামিল হই না। একসময় হুগলি জেলার বিখ্যাত জমিদার ছিলেন আমার বাবার দাদুরা। তাদেরই তৈরি এই বাড়ি। বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলাই ভালো। যদিও বেশীরভাগ অংশ এখন ভগ্নপ্রায়, জঙ্গুলে, তালাবন্ধ। জীবিত প্রাণী বলতে আমি, বাবা, মা, আমাদের সরকার দাদু, দারোয়ান রাম সিং আর কুক কাম কেয়ারটেকার সুখিয়া।
এরা তিনজনেই ষাটোর্ধ। আমার দাদুর আমল থেকে বাড়িতেই আছে। শুধু বাবাই নয়, আমিও এদেরই কোলেপিঠে মানুষ। সেদিন দূর থেকেই নমস্কার সেরে বাড়ি ফিরেছিলাম আমরা। টর্চ জ্বালিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল রাম সিং। আমাদের গলিপথে পাশাপাশি দুজন হেঁটে চলাও ভারী মুশকিল। মাঝে মাঝে এই ভেবে অবাক হই যে কিভাবে এই এঁদো গলির মধ্যে এত বিশাল বাড়ি খাড়া করা হয়েছিল।

আমাদের সরু অন্ধকার গলিতে সন্ধে থেকে পঞ্চাশ গজ অন্তর আলো জ্বলে। ষাট পাওয়ারের হলদেটে বাল্ব - অন্ধকারে মনে হয় যেন একচোখওয়ালা কোনো লম্বা দানব তার ঘোলাটে চোখে নিষ্পলকে তাকিয়ে আছে। তাতে অন্ধকার বাড়ে বই কমে না।

দোতলায় আমার পড়ার ঘরের ঠিক পাশেই ওরকমই একটা ল্যাম্পপোস্ট আছে। বড়বড় গরাদ দেওয়া জানলা দিয়ে পর্দা ভেদ করে আবছা আলো এসে ঘরের মেঝেতে নানারকম আঁকিবুঁকি কাটে। আরেকটা জানলার পাশেই আমার পড়ার টেবিল। জানলার ঠিক গা ঘেঁষেই একটা শিউলি ফুলের গাছ। শরৎকালে গন্ধে ঘর ম ম করে। কিছুদূরে সোজা গঙ্গার ঘাট চোখে পড়ে। 
কলেজ খুললেই টেস্ট। খুব ভালোভাবেই জানি যে আগামী পাঁচদিন বই ছুঁয়েও দেখা হবে না। আর আমাদের গার্লস কলেজে খুব কড়াকড়ি - কলেজ না বলে স্কুলই বলা ভালো। টেস্টে অ্যালাও না হতে পারলে সে বছর কোনভাবেই ফাইনালে বসতে দেওয়া হয় না।
 রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর এগারোটা নাগাদ তাই বই নিয়ে বসেছিলাম। কলকাতা শহরে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে হলে ইউ আর অলওয়েস ওয়েলকাল টু আওয়ার নেইবরহুড।
জানলা দিয়ে হালকা হাওয়ায় শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। দূরে গঙ্গার ঘাটে ছোট্ট ছোট্ট আলোর বিন্দুর আনাগোনা দেখতে দেখতে কেমন যেন ঘোর লেগে গিয়েছিল। জানি না কতক্ষণ একভাবেই বসেছিলাম।
হঠাৎ পায়ে ভিজে ছোঁয়া পেয়ে চমকে উঠলাম।
ঘর অন্ধকার। টেবিলে শুধু আমার স্টাডিল্যাম্পটা জ্বলছে। ভীষণ চমকে অনুভব করলাম আমার গোড়ালি অবধি জলে ডুবে গেছে! বৃষ্টি হলে একতলায় জল ঢোকে, কিন্তু আমি তো দোতলায়!  সভয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। জল হু হু করে বাড়ছে।
জল এখন আমার হাঁটু অবধি - ইষৎ গরম আর ভারী। ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম যে কয়েক মূহুর্ত কিছু ভাবতেও পারিনি। আলো জ্বালানোর জন্য পিছন ফিরতেই চোখ পড়ল মেঝের দিকে, কিন্তু মেঝে তো আর দৃশ্যমান নয়। জানলা দিয়ে আসা আবছা আলোর আলপনা চিকমিক করছে যে তরলটার ওপর সেটার রঙ লাল, গাঢ় লাল! আর অদ্ভুত একটা নোনতা পরিচিত গন্ধে ঘর যেন ভরে গেছে - রক্ত!
হে ভগবান! রক্ত!

ঘর ভর্তি রক্ত ততক্ষণে আমার কোমর ছাড়িয়েছে। আমি পাগলের মত ছপছপিয়ে পা টেনে এগোতে গেলাম বন্ধ দরজার দিকে। পারলাম না। পায়ে জড়িয়ে পড়ে গেলাম। আমার জামাকাপড়, মুখ, মাথা নোনতা লালে সম্পূর্ণ সিক্ত। এত রক্ত আসছে কোত্থেকে! মাথা কাজ করছে না। আমার বুক ছাড়িয়ে চিবুকে রক্তের ছোঁয়া লেগেছে।
চিৎকার করে মা কে ডাকতে গেলাম। হাঁ করতেই মুখ দিয়ে হুড়মুড় করে রক্ত ঢুকে এল। বিকট গন্ধে আর স্বাদে বমি পেয়ে গেল। আমার পা ততক্ষণে আর মাটিতে নেই। রক্তের পুকুর আমার মাথা ছাড়িয়েছে। আমি ভাসছি, আবার ডুবছি। আমি সাঁতার জানি না - সরকার দাদু অনেক চেষ্টাতেও শেখাতে পারেনি।

কড়িকাঠটা এখন নাগালের মধ্যে। ভীষণ ঝড়ের মাঝে মানুষ খড়কুটোকেও আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। সর্বশক্তি দিয়ে শরীরটাকে ছুঁড়ে দিয়ে হাত বড়িয়ে কড়িকাঠটা ধরার একটা মরিয়া চেষ্টা। ফস্কাতেই আমি ঝুপ করে ডুবে গেলাম অনেকটা। চারিদিকে তীব্র লাল অর্ধস্বচ্ছ তরলের মধ্যে আবছা দেখতে পেলাম আমার দিকে কেউ সাঁতরে এগিয়ে আসছে। অন্ধকার এক মূর্তি। তার চুলগুলো সাপের উদ্যত ফণার মত এলোপাথাড়ি রক্তের মাঝে খেলা করছে। আতঙ্কে ছটফটিয়ে উঠতেই আমার মুখ নাকের মধ্যে দিয়ে প্রচন্ড বেগে রক্তের তোড় দম বন্ধ করে দিতে লাগল। আমার ফুসফুস জ্বলে যেতে লাগল, বুকটা মনে হল ফেটে যাবে, চোখ বিস্ফোরিত, আমি মরে যাচ্ছি......

ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল ঘোর কাটতে। সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে জবজব করছে। বুকটা হাপরের মত ওঠানামা করছে। সামনের জানলা দিয়ে দূরে গঙ্গার ঘাটের দু চারটে মিটমিটে আলো দেখা যাচ্ছে। সামনে ফিজিক্সের বই খোলা। টেবিল ল্যাম্পটাও জ্বলছে। কোথায় রক্ত? মেঝেতে এক ফোঁটা জলও পড়ে নেই! কোনরকমে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। হাঁটুদুটো থরথর করে কাঁপছে। কোনমতে বিছানার কাছে এসে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে বালিশের ওপর রাখা ফোনটা তুলে নিয়ে লক বাটন প্রেস করলাম। রাত দুটো বেজে তেতাল্লিশ।
আ-আ-আমি স্বপ্ন দেখছিলাম! এতক্ষণ তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম! ভয়ে আমার হাত পা তখনও অসাড়। সেই বীভৎস রক্তের পুল যেন চোখের সামনে ভাসছে। রক্তের সেই জঘন্য নোংরা গন্ধ আর স্বাদ যেন আমার ইন্দ্রিয়গুলোকে এখনও বশীভূত করে রেখেছে। তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম! এত আসল!
মানে কি এই স্বপ্নের? আগে তো কখনও এরম স্বপ্ন দেখিনি!
গলা শুকিয়ে কাঠ। শরীরের কাঁপুনি ধীরে ধীরে থামছে। নার্ভগুলো থিতু হচ্ছে। ফোনটা বালিশের ওপরেই রেখে ক্লান্তভাবে এগিয়ে গেলাম গলির জানলার দিকে। জানলা থেকে জলের বোতলটা তুলে নিয়ে ছিপি খুলে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে জানলার দিকে তাকাতেই রক্ত জল হয়ে গেল।

চার হাতে পায়ে জানলার গরাদ ধরে অদ্ভুত বিকৃত ভঙ্গীতে আটকে আছে একটা মানুষ। না! মানুষ কি করে হয়! মানুষ কি পা দিয়ে কিছু ধরতে পারে!
হাত থেকে জলের বোতলটা মাটিতে পড়ে গেল। মূর্তিটার ঠিক পিছনে ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলো থাকায় মুখ দেখা যাচ্ছে না - শুধুমাত্র অন্ধকার একটা বিকৃত সিল্যুয়েট। মাথার চুলগুলো উদ্যতফণা সাপের মত হালকা বাতাসে উড়ছে। এ-এই জিনিসটা যাই হোক না কেন মানুষ হতে পারে না। আতঙ্কে আমার গলা বুজে এল। নড়তেও পারলাম না।
প্রস্তরবৎ আমাকে উদ্দেশ্য করেই হয়তো অদ্ভুত বিকৃত কন্ঠস্বরে হিসহিস করে দুর্বোধ্য কিছু একটা বলে উঠলো জিনিসটা। তারপরেই একটা বিকট কানফাটা অট্টহাসি। আমার মাথা ঘুরে গেল। 

চিৎকার করে উঠতেই দেখি বসে আছি আমার পড়ার টেবিলে। কপালে, ঘাড়ে, গলায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সামনের বইটা বন্ধ করা। জলের বোতলটা মেঝেতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। বোতল থেকে গড়ানো জল জমা হয়েছে ঘরের কোণে। আবার স্বপ্ন!
জানলার দিকে তাকিয়ে দেখি আকাশে সাদাটে ফ্যাকাশে ছোপ ধরেছে। পুবের আকাশ লাল। আড়ষ্ট হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলাম চেয়ারেই। পাশের বাগান থেকে কিচিমিচি ভেসে আসতে শুরু করার পর চেয়ার ছেড়ে উঠলাম। হাত আর পায়ের চেটো ঠান্ডা বরফ। বালিশের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে দেখি চারটে কুড়ি। ভোর হয়ে গেছে।

সারারাতটা তাহলে আমি চেয়ারে বসে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিয়েছি স্বপ্ন দেখে? কিন্তু স্বপ্ন কি এতটা জীবন্ত হয়? এমনিতে আমি খুব সাহসী মেয়ে। এই বিশাল আদ্যিকালের বাড়ির দোতলায় আমার স্টাডি রুম। ক্লাস সেভেন এইট থেকেই আমি একা শুয়ে অভ্যস্ত। তাও আজ আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। জীবনে এই প্রথম।
ধুর! সত্যি তো ভয় পাইনি। ওগুলো তো স্বপ্ন। ল্যাপটপে অত্যধিক হরর মুভি দেখে আমার উর্বর মস্তিষ্কের বিকৃত কল্পনা।
ভোরের আলো ততক্ষণে সামনের জানলা দিয়ে ঢুকে উল্টোদিকের দেওয়ালে সাদা একটা আয়তক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। হাসি পেল। স্বপ্ন দেখে এরম ভয় পেয়েছি জানলে বন্ধুরা খুব একচোট খিল্লি নেবে। পড়া তো ছাই কিছুই হল না রাত্তিরে, এখন কদিন হবেও না - আজ ষষ্ঠী। বইটই গুছিয়ে রেখে নীচে চললাম। তাও মনে একটা খটকা রয়েই গেল..... স্বপ্ন! এত্ত আসল! যাকগে.....

সেদিন সকালেই জলখাবার খেতে বসে একটা দু:সংবাদ পেলাম। - নির্বাণ রায়।  (Follow Nirban on Facebook)

(পরবর্তী অংশ আগামীকাল রাত পৌনে নটায়।)

[কদিন আগে একটা ব্লগে অনেক পুরনো কিছু ভূতের গল্পের সন্ধান পেয়েছি। ছোটবেলায় পড়া। আমার তো মনে হয় আমাদের দাদু দিদাদেরও ছোটবেলাকার - এত্ত পুরনো। তার মধ্যে থেকেই একটা গল্পের প্লটকে নতুনভাবে রিক্রিয়েট করার চেষ্টা করছি। টানা অনেক বড় পোস্ট দিলে পাঠকরা বোর হতে পারেন ভেবে কয়েকটা অংশে দেবো। কেমন লাগল জানাবেন। শেষে আসল গল্পের নামটা জানিয়ে দেবো। তার মধ্যে দেখি কে গেস করতে পারে।]

No comments:

Post a Comment