Thursday, 9 May 2019

আজ দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টি হবে। ইস্কুল দু'পিরিয়ড আগেই ছুটি হবে। সপসপে কাকভেজা হয়ে সাইকেল রেস হবে। রাস্তা, মাঠ, পুকুর সব এক হয়ে যাবে। ঝকঝক করবে কালো পিচরাস্তা, ফাঁকা।
বাড়ি ফিরে খাতা বইগুলো পাখার নীচে মেলে দেওয়া হবে। 
ভাত খেতে বসে লাউ থেকে চিংড়িগুলো বেছে বেছে আলাদা করা হবে। কোনমতে নাকে মুখে ভাত গুঁজেই জার্সি গলিয়ে মাঠে ছোটা হবে।
বর্ষার প্রশ্রয়ে বেপরোয়া বেড়ে ওঠা সবুজ ঘাসের গোড়ায় এক গোড়ালি জল থাকবে। একপাল ছেলে থাকবে। ফার্স্টবয় নীলু থাকবে, চায়ের দোকানের রতনও থাকবে। পনেরো টাকার একটা পাওয়ার বল থাকবে। উইকেট পুঁতে গোলপোস্ট সাজানো হবে। হুটোপাটি, হুড়োহুড়ি, জড়ামড়ি, ধস্তাধস্তি। আহ! হেবি মস্তি। ভেজা ঘাসে স্লাইড মারা হবে। হলুদ, সাদা, নীল জার্সিগুলো কাদা মেখে ভূত সাজবে।
ঘন কালচে মেঘের শামিয়ানার নীচে বৃষ্টিধোয়া গাছপালা ঝলমলে সবুজ। পুকুরের ওপর ঝুঁকে পড়া নারকেল গাছটার ওপর দাঁড়িয়ে ঝাঁপ মারা হবে। ঝুপ ঝুপ ঝুপ ঝুপ। কালো স্থির জল তোলপাড়। এপার ওপার, দাপাদাপি। 
বাড়ি ফেরার গলি রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে হলদে আলোগুলো জ্বলে উঠবে। নতুন গজিয়ে ওঠা কংক্রিটের পাহাড়গুলো থাকবে না। রাস্তার ধারে ঝোপঝাড়, আগাছায় ভরা অন্ধকার জমি থাকবে। বড় বড় গাছ থাকবে। কাছে দূরে পরপর শাঁখের আওয়াজ শোনা যাবে। রাস্তার পাশের জানলা দিয়ে সিরিয়ালের চেনা গান কানে আসবে। ধুপের গন্ধে মন কেমন করে উঠবে।
দিদার বাড়ির খাটে কোয়েশ্চেন ব্যাঙ্ক খুলে বসা হবে। প্রদীপ দেখিয়ে দেখিয়ে দিদুন সন্ধে দিতে আসবে, নকুলদানা দেবে। এ প্লাস বি হোল স্কোয়্যার থেকে কখন কি জানি খাতার পেছনে কুট্টুসের ল্যাজ, ওবেলিক্সের ভুঁড়ি, পিকাচুর কান আর প্রফেসর শঙ্কুর দাড়ি আঁকা হয়ে যাবে। পেছনের জমিটা থেকে একটু গ্যাঙোর গ্যাঙোর, একটু ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ কানে আসবে।
দিদুন টেবিলে লুচি আর আলু ছেঁচকি রেখে ডাকবে। থালাটা জোর করে খাটে নিয়ে এসে আনন্দবাজার পেতে বসা হবে। খেলার খবরে চোখ আটকে যাবে। স্কুলে টিফিনে হজমি খেতে খেতে গৌরবের সাথে আড্ডার কথা মনে আসবে।
- ভাই, রোনাল্ডোকে সবাই 'মোটা' 'মোটা' বলে খুব অপমান করছে রে। চিন্তা হচ্ছে।
Gourab গম্ভীর হয়ে বলবে - চাপ নিস না, ওটা রোনাল্ডো।
লুচি খেয়ে ভূগোলের শর্ট কোয়েশ্চেন লিখতে বসলে তেলতেলে আঙুল থেকে পেন হড়কে হড়কে বেরিয়ে যাবে। দিদুন এসে সুনীল গাঙ্গুলি বা আশাপূর্ণা খুলে বসবে। লিখতে লিখতে সাবান দিয়ে তিনবার হাত ধুতে উঠতে হবে, একবার হিসি করতে, দুবার জল খেতে। দিদুন রান্নাঘরে গেলে চুপিচুপি হাত বাড়ানো হবে। ফোন না, লাইব্রেরি থেকে আনা হেমেন রায়ের বইটা হাতে উঠে আসবে। মাছের চপে কামড় বসিয়ে সুন্দরবাবু বলবেন 'হুম'। বইটার একটা কোণা উইপোকাতে খাওয়া।
ভৌতবিজ্ঞান বইতে লুকিয়ে জয়ন্ত, মানিক, বিমল, কুমারের সাথে কয়েক ঘন্টা এডভেঞ্চার হবে। ঘড়ির দিকে চোখ যেতেই আঁতকে উঠে টিভির রিমোট খোঁজা হবে। গোলগোল চোখ করে একটা বছর বারোর ছেলে টিভির সামনে বসে দাঁত দিয়ে নখ চিবোবে। টিভির অত সামনে বসিস না - ধমক খাবে।
হলুদ ন'নাম্বার জার্সি পরা একটা ন্যাড়া মাথা মোটা আনফিট লোক যার দুপায়ে অসংখ্য অপারেশন - কাকার বাড়ানো থ্রু বলটা ধরে ঘানার গোলকিপারের সামনে ইনসাইড-আউটসাইড করে মাটিতে বসিয়ে, ঘাড়ের ওপরের মুশকো ডিফেন্ডারটাকে পাশে ছিটকে দিয়ে আউটস্টেপের টোকায় জালে বল জড়িয়ে দেবে - নিষ্পাপ শিশুর মত তার একগাল হাসি। ক্লাস সেভেনের একটা ছেলের গায়ে কাঁটা দেবে, কান গরম। বাড়ির লোকের সামনে চোখের জল চাপার প্রাণপণ চেষ্টায় গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করবে।
এক ছুটে ওপরের লম্বা বারান্দায় গিয়ে ফুটবলটায় আনন্দে দুম দুম করে দুটো তিনটে শট মারা হবে। অত রাত্তিরে সারা বাড়ি কেঁপে উঠবে। মা চ্যাঁচাবে। গুটি গুটি পায়ে নীচে আসা হবে।
জানলার বাইরে আবার ঝিরঝির করে ইলশেগুঁড়ি শুরু হবে। ল্যাম্পপোষ্টের আলোরা আবছা। এ মাসের আনন্দমেলাটা পড়তে পড়তে চোখ জুড়িয়ে আসবে। কাল সকালে আবার ইস্কুল আছে।
কাল দুপুরেও মুষলধারে বৃষ্টি হবে।


No comments:

Post a Comment