Thursday, 9 May 2019

**থর ও তার অস্ত্রের ছোট্ট ইতিহাস**

অ্যাভেঞ্জার্স ইনফিনিটি ওয়ার দেখতে গেছিলাম গ্যাংটকের ডেনজং সিনেমা হলে। ছোট্ট সুন্দর সাজানো গোছানো হল। সেসব পরে কখনো বলবো। সিনেমাটা কেমন লাগল তার বিষদে না গিয়ে একটা কথাই বলবো যে মাত্রাতিরিক্ত পপুলারিটি হয়ে গেলেই যেকোন জিনিস গেঁজে যায়। মার্ভেলের এই সিরিজ যখন শুরু হয়েছিল তখন ক্লাস নাইনে বোধহয় পড়ি। বাড়িতে কম্পিউটার থাকলেও নেট ছিল না। এক বন্ধুর বাড়ি থেকে ডাউনলোড করে এনে দেখতাম। পরে হলেও গেছি অনেকবার। কিন্তু শালা লাস্ট কিছু বছরে কম পয়সায় নেট পেয়ে প্রচুর ভুলভাল পাবলিক ঢপের চপ কিছু না বুঝেই সবেতে পোঁদ পাকামি মেরে সস্তায় ট্রেন্ড ফলো করার জন্য আর কুল হওয়ার জন্য সব জিনিসে নাক গলাচ্ছে। প্রোডিউসাররাও ভাই স্রেফ মাল্লু বোঝে। তারা মাস আপিলের জন্য আরো বেশী খরচা করে আরো কম স্টোরিলাইনওয়ালা ক্লিশে মাল নামাচ্ছে। যেমন গেম অফ থ্রোনসটার এখন দশা। ২০১৩ সাল থেকে আমি গেম অফ থ্রোনস দেখি, তখন খুব কম লোক দেখত। বইগুলোও পড়ে নিয়েছিলাম। ওই ২০১৭ নাগাদ থেকে থেকে গুচ্ছের ছেলেপুলে বন্ধুবান্ধবদের কাছে 'ক্লাস' বজার রাখার জন্য জোর করে দেখা শুরু করল আর সে মালও গেঁজে গেল। যাইহোক, আমার আজকের লেখার বিষয়টা অন্য। বেশীরভাগ পাবলিকই থরকে চেনে মার্ভেলের সুপারহিরো হিসেবে। আর আমেরিকানরা তো সব জিনিসই নিজেদের মত গড়েপিটে তৈরি করে নেয় আর গোটা দুনিয়া তা হাঁ করে গেলার জন্য বসে থাকে। থর কমিক্স বা সিনেমাগুলো নিয়ে আমার কোনো কমপ্লেইন নেই, বরং মার্ভেল সিরিজের মধ্যে আমার সবথেকে প্রিয়। তবে এই ইনফিনিটি ওয়ারে থরের অস্ত্র বানানোর ব্যাপারটা খুব যাতা লেভেলের বাজেভাবে পোর্ট্রে করা হয়েছে। তাই যারা ঈত্রি, থর, থরের অস্ত্র এসবের ইতিহাস জানেন না, মার্কিনি মুভি দেখে মিসগাইডেড হচ্ছেন তাদের জন্যই এই লেখাটা রইল। শৈশবে সুকুমার, কৈশোরে 'এজ অফ মাইথোলজি' আর দামড়া বয়সে Neil Gaiman আমার নর্স মাইথোলজির বেস তৈরি করেছেন। তাই বিশ্বাস করে দেখতে পারেন। ভুল তথ্য খুব একটা দেবো না। খুব ছোট করে লিখলাম। তাড়াহুড়োয় ভুল ত্রুটি কিছু হয়ে থাকলে মার্জনা করবেন।

নরওয়ের যুদ্ধের দেবতা ওডিনপুত্র থর ছিলেন অসীম শক্তিধর। তিনি আবার বজ্রের দেবতাও বটে। থরের শক্তি আর মেজাজের সাথে দেবতা থেকে অসুর সকলেই ভালোরকম পরিচিত ছিল। থরকে সহজে কেউ ঘাঁটাত না। রগচটা থরের একটা কোমরবন্ধ ছিল যেটা কোমরে বাঁধলে তার শক্তি বহুগুণ বেড়ে যেত। স্বর্গের সেরা সুন্দরী সিফ ছিলেন থরের স্ত্রী। তার ঝরণার জলের মত কোমর অবধি নেমে আসা সোনালি চুলের দিকে সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। তো যাই হোক, একদিন সকালে থরের ঘুম ভাঙল সিফের চেঁচামিচিতে। সব দেখে শুনে তো থরের আক্কেল গুড়ুম। সিফের মাথাজোড়া সোনালি চুল গোড়াসুদ্ধু উধাও হয়ে গেছে। কোথাও তার লেশমাত্রও নেই। ন্যাড়ামাথা সিফ তো হাউমাউ করে কেঁদেই চলেছে। এসব দেখেশুনে বেদম রেগে থর গিয়ে পাকড়াও করল লোকিকে কারণ সবাই জানে যে দুর্বুদ্ধি আর দুষ্টুমির দেবতা লোকি বিনা কারণে অপরের ক্ষতি করতে চাইলে আর কিছু চায় না। বেদম ঠ্যাঙানি খেয়ে লোকি তার শয়তানি কবুল করে বলল যে থরের স্ত্রীর জন্য সে এত সুন্দর সোনার চুল এনে দেবে যে তার তুলনা স্বর্গ মর্ত্য পাতালে হয় না। থর বলল ভাল কথা কিন্তু লোকি যদি তা নিয়ে আসতে না পারে তবে থর লোকির শরীরের সবকটা হাড় একে একে মড়মড়িয়ে ভাঙবে।
ব্যাজার মুখে লোকি চলল স্বার্তালহেইম (Svartalfheim) বা বামনলোকে, কারণ কে না জানে যে বামনরা এই মহাজগতের সবচেয়ে দক্ষ কারিগর - তারা তৈরি করতে পারে না এমন জিনিস নেই।
ইভালডির তিন ছেলে ছিল বামনলোকের শ্রেষ্ঠ তিন কারিগর। লোকি তাদের কাছে গিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বলল যে স্বর্গের দেবতারা একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন যেখানে আসগার্ডের তিন মহান দেবতার জন্য একটি করে উপহার তৈরি করতে হবে। আদি দেবতা ওডিন, বজ্রদেব থর আর সমৃদ্ধির দেবতা ফ্রে হবেন বিচারক। যার তৈরি উপহার দেবতাদের সবচেয়ে মনে ধরবে তাকে মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ কারিগর ঘোষণা করা হবে। আর হ্যাঁ, এইসব উপহারের মধ্যে অবশ্যই খাঁটি সোনার ঘন লম্বা চুল থাকতে হবে যা কিনা কারো মাথায় চাপালে একদম গোড়া থেকে আটকে যাবে, আর তার বাড়বৃদ্ধি হবে প্রাকৃতিক চুলের মত। লোকিকে কেউ বিশ্বাস করত না। ইভালডির ছেলেরা লোকিকে জিজ্ঞেস করল এতে তার কোন স্বার্থ আছে কি না। লোকি বলল, "হায় কপাল, আমার আবার কিসের স্বার্থ! দেবতারা সব বলাবলি করছিলেন যে ব্রক্ (Brokk) আর ঈত্রি (Eitri) দুই ভাই নাকি সেরা কারিগর আর বাজি তারাই জিতবে। তাই আমি ভাবলুম ব্যাপারটা তোমাদেরও জানা দরকার কারণ যতই হোক তোমরাও তো মন্দ নও।"
ইভালডির ছেলেরা ব্রক্ আর ঈত্রিকে মোটেই সহ্য করতে পারত না। তারা বেদম রেগে বলল, "ছো:! সামান্য একটা গাঁইতি তৈরি করতে যাদের হাত কাঁপে তারা আবার কিসের কারিগর? তারা নাকি আবার দেবতাদের জন্য উপহার তৈরি করবে। বাজি তো আমরাই জিতব।"
মহা খুশি হয়ে লোকি চলল দুই বামন ভাই ব্রক্ আর ঈত্রির কাছে। আসগার্ডের প্রতিযোগিতার কথা তাদের জানিয়ে লোকি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "দেখো তোমরা কদ্দূর কি করতে পারো। ইভালডির ছেলেরা তো তোমাদের নামে যা নয় তাই বলল। বলে একটা সামান্য গাঁইতি তৈরি করতে যাদের হাত কাঁপে তারা নাকি বানাবে দেবতাদের উপহার! তবে আমি চাই যেন জয় তোমাদেরই হোক।"
দুই ভাইয়ের মধ্যে ঈত্রি ছিল দুর্দান্ত কারিগর কিন্তু ব্রক্ ছিল অত্যন্ত চতুর। লোকিকে সে জিজ্ঞেস করল, "কি ব্যাপার লোকি? আমাদের জন্য দরদ দেখছি একদম উথলে উঠছে! এর ভেতরে তোমার কোনো গল্প নেই তো?"
লোকি সাধাসিধে নিষ্পাপ মুখ করে বলল, "ইয়ে, কই? না তো।"
ব্রক্ লোকিকে বলল, "আচ্ছা ঠিকাছে লোকি। আমরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেবো কিন্তু যদি আমরা জিতি তবে তোমার মুন্ডুটা কিন্তু আমার চাই। তোমার এই মুন্ডুটা এক আশ্চর্য জিনিস লোকি। সবসময় জটিল কুটিল চিন্তাভাবনায় ঠাসা। ওটি দিয়ে আমি আর ঈত্রি একটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করতে সক্ষম যন্ত্র বানাবো।"
ভেতরে ভেতরে চটে গেলেও লোকি কাষ্ঠ হেসে বলল, "হেঁহেঁ, ঠিকাছে। তাই হবে এখন।"
ব্রক্ আর ঈত্রি যখন দেবতাদের উপহার তৈরি করা শুরু করবে ঈত্রি তার ভাইকে দেবে হাপর ঠেলার ভার। লোকি নানাভাবে তাদের কাজ পন্ড করার চেষ্টা করবে। অনেকটা টাইপ করতে হবে বলে সে গল্পে আর যাচ্ছি না। মোট কথা, লোকি মস্তবড় একটা ভীমরুলের রূপ ধরে গিয়ে ব্রকের কপালে এমন জোর কামড়াবে যে তার হাত নড়ে হাপর থেকে যতটা হাওয়া বেরনোর কথা সেই মাপে গণ্ডগোল হয়ে যাবে আর তাদের শেষ উপহারটায় খুঁত রয়ে যাবে।
মহা খুশি হয়ে লোকি আসগার্ড ফিরে এসে ধুমধাম করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করল। লোকির মনমেজাজ বেশ ফুরফুরে কারণ সে জানে ব্রক্ আর ঈত্রির জেতার সুযোগ সে পন্ড করে দিয়েছে আর বউয়ের সোনার চুল দেখে খুশি হয়ে থর ইভালডি পুত্রদেরই বিজয়ী ঘোষণা করবে। সুতরাং বাজি হেরে মুন্ডুর হারানোর কোন ভয় তার নেই। যথাসময়ে সব কারিগররা এসে দেবাদিদেব ওডিন, বজ্রের দেবতা থর আর রূপবান ফ্রে'র সামনে তাদের উপহার পেশ করতে লাগল।
ইভালডির পুত্ররা প্রথমে ওডিনের সামনে পেশ করল একটি সোনার ঝকঝকে বালা। প্রতি নবম রাত্রিতে ওই বালা থেকে আটটি করে সমান মাপের ও মানের বালা ঝরে পড়বে, যা ওডিন নিজের সম্পদ বৃদ্ধিতে বা কাউকে উপহার দিতে কাজে লাগাতে পারবেন। থরের সামনে তারা নিবেদন করল অপূর্ব সুন্দর সোনার চুল যা সিফের মাথায় সুন্দরভাবে একেবারে গোড়া থেকে বসে গেল। ফ্রে কে তারা দিল পশমের একটি রুমাল যা ভাঁজ খুললেই দুর্দান্ত একটি জাহাজে পরিণত হয় এবং তা জল, স্থল ও আকাশ সব জায়গাতেই চলতে পারে।
উপহার পেয়ে দেবতারা সকলেই খুব খুশি হলেন।
এবার পালা ব্রক্ ও ঈত্রির।
ওডিনকে তারা উপহার দিল একটি বর্শা যা সমস্তকিছুকে ভেদ করতে সক্ষম আর কখনো তা লক্ষ্যচ্যূত হবে না। ফ্রে'র জন্য তারা এনেছিল একটি স্বর্ণবরাহ যার দাঁতগুলো অন্ধকারে জ্বলে আলো দেখাবে আর বরাহটিকে রথের সাথে জুড়লে জগতের সবচেয়ে দ্রুতগামী যানে পরিণত হবে।
সর্বশেষে এল থরের উপহারটির পালা যেটি তৈরির সময়তেই লোকির শয়তানিতে খুঁত রয়ে গিয়েছিল। লোকি তো মনে মনে খুব খুশি।
ব্রক্ বলল, "দেবতাদের সামনে আমি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারণ আমার হাত কেঁপে গিয়ে এই উপহারটিতে একটু খুঁত রয়ে গেছে। আমার ভাই ঈত্রির তৈরি এই উপহার মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মের মর্যাদা পেত যদি না আমার হাত কেঁপে যেত।"
থর অধৈর্য্য হয়ে বলল, "ঠিক আছে, ঠিক আছে। আগে দেখাও তো তোমার উপহার।"
রেশমের ঢাকা সরিয়ে ব্রক্ আর ঈত্রি থরের সামনে রাখল একটি হাতুড়ি। মাথাটা বড় কিন্তু হাতলটা ছোট।
ব্রক্ বলল, "আমার দোষে এর হাতল কিছুটা ছোট হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু এই হাতুড়ি হল সর্বলোকের সর্বশক্তিমান অস্ত্র। এর নাম ম্যলনির (Mjolnir)। যত জোরেই যা কিছুকেই আঘাত করুন না কেন এই হাতুড়ি ভাঙবে না। আর যেখানেই ছুঁড়ুন না কেন এ হাতুড়ি সবসময় আপনার হাতেই ফেরত আসবে।"
মহাশক্তিমান থরের হাতে কোন অস্ত্রই টিকত না। থর যে কতবার জোরে আঘাত করতে গিয়ে অস্ত্র ভেঙেছে আর শত্রুদের ছুঁড়তে দিয়ে অস্ত্র হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তাই এই হাতুড়ির গুণাবলি শুনে আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে থর হাততালি দিয়ে উঠল। দেবতারা সকলে একমত হয়েই ব্রক্ আর ঈত্রিকে কারিগরশ্রেষ্ঠ ঘোষণা করলেন। এই হল থরের হাতুড়ি ম্যলনিরের ইতিহাস।
লোকি আর তার মুন্ডুর কি হল? চালাকি পেয়েছেন? সব আমি বলে দেব? গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে বই পত্তর কিনে পড়ুন জেনে যাবেন।


No comments:

Post a Comment