নির্বান রায়।
প্রচন্ড অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল মুনের। চোখ খুলে অন্ধকারে কিছু ঠাহর করতে পারল না কিছুক্ষণ। এই ঠান্ডাতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। হাতড়ে হাতড়ে ডান দিকে বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে লক বাটন প্রেস করল। ফোনের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। চোখ ছোট করে তাকিয়ে মুন দেখল একটা চল্লিশ বাজে। বাবা মা'র আসতে এখন অনেক দেরী। নাইট ডিউটি করে ফিরতে সাড়ে পাঁচটা তো বাজবেই। কনুইতে ভর দিয়ে উঠে বসে বিছানার বাঁ দিকে কাচের জানলার পর্দাটা হাত দিয়ে সরিয়ে বাইরে তাকাল। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। দূরে বাগানের গেটের হলদে আলোটা বৃষ্টির পর্দায় ঢেকে ঝাপসা হয়ে দেখা যাচ্ছে। চারদিকে কালো কালো ঝুপসি গাছগুলো থমথমে হয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে।
মুন বুঝতে পারল না ঘুমটা হঠাৎ ভাঙল কি করে। একটা আবছা চিৎকার কিরম ঘোরের মত কানে লেগে আছে। বুঝতে পারল না স্বপ্ন দেখছিল কি না। অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না। গলা শুকিয়ে কাঠ। বিছানা থেকে পা ঝুলিয়ে চটিতে পা গলালো মুন। ডোরনব টা ঘোরাতেই দরজা খুলে গেল। ছিটকিনি দিয়ে শোয় না মুন।
ফরেস্ট অফিসার বাবার বদলির জন্য এই বাংলোতে তারা এসছে মোটে মাসখানেক। মা ডাক্তার - হসপিটালের নাইট ডিউটি থাকে। দুজনেই ড্রাইভ করে বেরিয়ে যায়। বেবী মাসি নীচের ড্রয়িং রুমে সোফায় শোয়। মা বার বার করে বলে 'বেবী তুই সোফায় কেন শুস? ঘরে শুতে কি তোকে বারণ করা আছে?' কিন্তু ওই সিনেমার নেশা। রাত্তির অবধি 'বই' দেখতে দেখতে সোফাতেই হাঁ করে কাত হয়ে পরে। দরজাটা খুলতেই আজ মুনের বুকটা হঠাৎ কেমন ছ্যাঁত করে উঠল। সামনে অন্ধকারের দেওয়াল। চোখ চলে না যেন। রাত্রে যে কোন কাজে উঠলেই মুন আলো জ্বালে না। ফোন জ্বেলে জ্বেলেই এদিক ওদিক করা অভ্যেস। কিন্তু আজ কিরকম একটা অদ্ভুত ইতস্ততবোধ কাজ করছে মনের মধ্যে। মোবাইলের আলোটা জ্বেলে মুন পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে। মোবাইলের আলোটা বাঁ হাতে গার্ড করে সিঁড়ির ল্যান্ডিং এর কাছে দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল মুন। নীচে ড্রয়িংরুম থেকে কোন আওয়াজ আসছে না। খটকা লাগল। শনিবার রাতে সিনেমা ছেড়ে মাসী এত তাড়াতাড়ি শুয়ে পরল? হয়তো শরীর খারাপ। নিজের মনকে বোঝাল সে। খুব কমন এক্সপ্ল্যানেশন। তাও অস্বস্তি গেল না। দেওয়ালের পাশ দিয়ে মাথাটা ঝুঁকিয়ে অল্প বার করে ড্রয়িংরুমে হালকা নীলচে ও কম্পমান একটা আলোর আভাস পেল মুন। উৎসটা বুঝতে পারা গেল না। চটিটা পা থেকে সন্তর্পণে খুলে ফেলে সিঁড়ির দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আস্তে আস্তে নামতে লাগল মুন। ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুমের পুরোটা চোখের নাগালে এল।
আলোটা টি.ভি.'র। কোনো শব্দ নেই। স্ক্রিনে হিজিবিজি ঝিরঝিরে লাইন আসা যাওয়া করছে। ঝড় বৃষ্টিতে কেবল চলে যাওয়াটা এখানে খুব কমন সেটা এই একমাসেই মুন বেশ বুঝে গেছে। কিন্তু টি.ভি. টা চলছে কেন? সোফাটা টি.ভি.'র দিকে মুখ করানো। সোফার পিছন দিক থেকে মুন আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। উঁকি মেরে দেখল সোফা খালি। মাসীর ওড়নাটা সোফায় আর বালিশটা সোফার পায়ের কাছে মেঝেতে পরে আছে। শিড়দাঁড়া দিয়ে একটা শিহরণ নেমে গেল মুনের। হয়তো বেবী মাসী বাথরুমে গেছে। কিন্তু কি যেন একটা অজানা আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে। পা টিপে টিপে বাথরুমের দিকে এগোল মুন। আলো জ্বালল না। ফোনটাকে কেপরির পকেটে চালান করে দিয়ে নিশ্বাস চেপে এগোতে লাগল বাথরুমের দিকে। অদ্ভুত আনফ্যামিলিয়ার কিছুর অস্তিত্ব আজ বাড়ির মধ্যে টের পাচ্ছে মুন। কিন্তু বুঝতে পারছে না কি সেটা। বাথরুমের কাছে গিয়ে দরজায় আলতো করে হাতের চাপ রাখল মুন। ভিতর থেকে বন্ধ। কিছুটা আস্বস্তি পেল মুন। মাসি তাহলে বাথরুমে। দরজায় আলতো করে কান পাতল সে। কোন শব্দ নেই - না কী ওটা কারো নিশ্বাসের শব্দ? 'মাসি' বলে ডাকতে গেল মুন - হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে 'ঠং' করে ধাতব কিছু একটা মেঝেতে পরার শব্দ ভেসে এল কিচেনের দিক থেকে। গায়ে কাঁটা দিয়ে শিউরে উঠল মুন। বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল দূরে রান্নাঘরের অন্ধকার দরজার দিকে। ড্রয়িংরুমের মাঝে টি.ভি'র হালকা আলো যেন অন্ধকারকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। কে? কে আওয়াজ টা করল? বাড়িতে তো তারা দু'জন ছাড়া আর কেউ নেই। মাসি তো বাথরুমে! তাহলে!
আলোটা টি.ভি.'র। কোনো শব্দ নেই। স্ক্রিনে হিজিবিজি ঝিরঝিরে লাইন আসা যাওয়া করছে। ঝড় বৃষ্টিতে কেবল চলে যাওয়াটা এখানে খুব কমন সেটা এই একমাসেই মুন বেশ বুঝে গেছে। কিন্তু টি.ভি. টা চলছে কেন? সোফাটা টি.ভি.'র দিকে মুখ করানো। সোফার পিছন দিক থেকে মুন আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। উঁকি মেরে দেখল সোফা খালি। মাসীর ওড়নাটা সোফায় আর বালিশটা সোফার পায়ের কাছে মেঝেতে পরে আছে। শিড়দাঁড়া দিয়ে একটা শিহরণ নেমে গেল মুনের। হয়তো বেবী মাসী বাথরুমে গেছে। কিন্তু কি যেন একটা অজানা আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে। পা টিপে টিপে বাথরুমের দিকে এগোল মুন। আলো জ্বালল না। ফোনটাকে কেপরির পকেটে চালান করে দিয়ে নিশ্বাস চেপে এগোতে লাগল বাথরুমের দিকে। অদ্ভুত আনফ্যামিলিয়ার কিছুর অস্তিত্ব আজ বাড়ির মধ্যে টের পাচ্ছে মুন। কিন্তু বুঝতে পারছে না কি সেটা। বাথরুমের কাছে গিয়ে দরজায় আলতো করে হাতের চাপ রাখল মুন। ভিতর থেকে বন্ধ। কিছুটা আস্বস্তি পেল মুন। মাসি তাহলে বাথরুমে। দরজায় আলতো করে কান পাতল সে। কোন শব্দ নেই - না কী ওটা কারো নিশ্বাসের শব্দ? 'মাসি' বলে ডাকতে গেল মুন - হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে 'ঠং' করে ধাতব কিছু একটা মেঝেতে পরার শব্দ ভেসে এল কিচেনের দিক থেকে। গায়ে কাঁটা দিয়ে শিউরে উঠল মুন। বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল দূরে রান্নাঘরের অন্ধকার দরজার দিকে। ড্রয়িংরুমের মাঝে টি.ভি'র হালকা আলো যেন অন্ধকারকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। কে? কে আওয়াজ টা করল? বাড়িতে তো তারা দু'জন ছাড়া আর কেউ নেই। মাসি তো বাথরুমে! তাহলে!
কিন্তু কিন্তু বাথরুমে যদি ওটা মাসি না হয়ে অন্য কিছু হয়! গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে মুনের। হয়তো মাসি কিচেনে লুকিয়ে আছে বাথরুমে যে আছে তার থেকে বাঁচতে। পা গুলো কেউ যেন আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে মেঝেতে। গলার কাছে কান্নাটা যেন দলা পাকিয়ে আটকে আছে। ভয়েতে কান্নাটাও বেরোচ্ছে না - যদি কেউ শুনতে পেয়ে যায়। চুড়ান্ত আতঙ্কের মূহুর্তেও মানুষের কৌতূহল কখনো কখনো যেন ভয়কে অতিক্রম করে ফেলে। অতি কষ্টে কাঁপা কাঁপা পায়ে কিচেনের দিকে এগোতে থাকল মুন। মাসি যদি ওখানে থাকে। টি.ভি. আর সোফা ছাড়িয়ে আস্তে আস্তে কিচেনের দিকে এগোতে লাগল সে। কিচেনের যত কাছে এগোতে লাগল অদ্ভুত একটা বন্য গন্ধ যেন তত বেশী নাকে আসতে লাগল - আর মাংসের দোকানে যেরম গন্ধ পাওয়া যায়।
কিচেনে ঢুকেই বাঁ হাত বাড়িয়ে দেওয়ালের সুইচটা মারল। আলোটা খুব হালকা হয়ে জ্বলল। সেই আলোয় মুন দেখল মেঝের ওপর রক্তে মাখামাখি হয়ে পরে আছে বেবী মাসির দেহটা। পেটটা চেরা আর ভেতরের নাড়িভুঁড়ি মেঝেতে ছড়ানো। হাত পা মুখ যেন কেউ খুবলে খুবলে খেয়েছে। হুড় হুড় করে বমি করতে করতে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পরল মুন। মাথা বনবন করে ঘুরছে। আর সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হল মাসি এখনও জীবিত। বাঁ পাটা একটু একটু নড়ছে। বিস্ফোরিত চোখ দুটো মুনের দিকে তাকিয়ে যেন কিছু বলতে চাইছে, পারছে না - জিভটা মুখ থেকে যেন কেউ বা কি কামড়ে খুবলে নিয়েছে। একবার ছটফট করে উঠেই স্তব্ধ হয়ে গেল মাসির দেহটা। মুন আর পারছে না। গলার কাছটা প্রচন্ড ব্যথা করছে কান্না চেপে রেখে। চোখ দিয়ে জলের ধারা গড়াতে লাগল কিন্তু মুখ দিয়ে আওয়াজ করল না মুন - নিজের বাঁ হাতের চেটোটা সজোরে কামড়াতে লাগল কান্নার আওয়াজ চাপার জন্য। কাঁপা কাঁপা হাতে টেবল থেকে একটা কিচেন নাইফ তুলে নিয়ে কিচেনের বাইরে বেরিয়ে বাথরুমের দিকে এগোল - বাথরুমের দরজাটা বাইরে থেকে লক করবে বলে। কিছুটা গিয়ে থমকে দাঁড়াল মুন। বাথরুমের দরজাটা অর্ধেক খোলা আর ভিতরের অন্ধকারটা যেন মুনের দিকে তাকিয়ে আছে। ওই অন্ধকারের ভিতর কিছু যেন তাকে গিলে ফেলার জন্য ধারালো দাঁত নখ নিয়ে অপেক্ষা করে রয়েছে। মুন তাকে দেখতে পাচ্ছে না কিন্তু জানে যে তার একটা অসতর্ক মূহুর্তের জন্যই সে অপেক্ষা করে রয়েছে - যেমন করে বন্য জন্তুরা তাদের শিকারের জন্য অপেক্ষা করে থাকে।
শরীরের সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করে মুন হঠাৎ সিঁড়ির দিকে ছুটতে শুরু করল। সিঁড়ি দিয়ে ঝড়ের বেগে উঠে এসে কোনোরকমে নিজের ঘরের ঢুকেই দরজাটা লক করে তাতে পিঠ দিয়ে মেঝেতে বসে পরল সে। এবার কান্নার বাঁধ ভাঙল। পাগলের মত ককিয়ে ককিয়ে কাঁদতে লাগল মুন। কিছুক্ষণ পর ফোনটা হাতে নিয়ে বিছানায় উঠে জানলা দিয়ে অসহায়ের মত বাইরে তাকালো। অঝোরে বৃষ্টি পরছে। ধারে কাছে কেউ থাকে না - চেঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে ফেললেও সাড়া দেওয়ার কেউ নেই। ফোনটা অফ করে অন করল, বিছানায় উঠে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তুলল - তাও নেটওয়ার্ক পাওয়া গেল না। অসহায়ের মত বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল মুন। দুর্বল শরীরে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েই পরেছিল সে। হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসল। ফোনটা জ্বেলে দেখল চারটে কুড়ি বাজে। জানলার পর্দাটা সরিয়ে দেখল বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু আকাশ এখনো থমথম করছে। বাবা-মা'র আসার সময় হয়ে এল বলে। একটু সাহস পেল মুন। কিছু সময় মাত্র আর।
ফ্ল্যাশলাইটটা জেলে ঘরের দরজার দিকে ফেলল সে। দরজা লকড - স্বস্তির শ্বাস ফেলল মুন। আলোটা নামাতে গিয়ে মেঝের দিকে পরতে চমকে উঠল সে। দরজার কাছে মেঝেতে রক্তমাখা দুটো পায়ের ছাপ। মানুষের মতই কিন্তু মানুষের না - মানুষের পা কখনো এরম অদ্ভুত বিকৃত হতে পারে না। আতঙ্কে গলা বুজে এল মুনের। কম্পমান হাতে আলোটা আর একটু সরিয়ে আনল। পায়ের ছাপটা তার দিকে মুখ করে ক্রমশ এগিয়ে এসছে - মুনের খাটের তলায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে।।


No comments:
Post a Comment