Friday, 16 September 2016

চাগড়ি কাকু





।।চাগড়ি কাকু।।
                           - নির্বাণ রায়।
বেলা সাড়ে দশটার সময় গোটা দুয়েক ভারী ব্যাগ ঝুলিয়ে আসছিলুম বাজার থেকে। এই তো আজকে। বললে বিশ্বাস করবেন না বাড়ি থেকে দুশো গজ মতন দূরে জাস্ট - তখনই বৃষ্টিটা ঝুপ্পুস করে নামল। একবার ভাবলাম উইসেন বোল্ট হয়ে যাই - কিন্ত ব্যাগের ডিমগুলো ভাঙলে মা একদম কাপড় কেচে দেবে। পাশের দোকানের বাধ্য হয়ে রিফিউজ নিলাম। পাশ ফিরতেই দেখি এক এল.আই.সি কাকু হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে। দেখেই গা পিত্তি জ্বলে গেল। কান এঁটো করা একটা কম্পালসারি হাসি দিলুম।
বলে, 'বাবা কেমন আছে খোকা?'
পরিষ্কার মনে আছে দু'দিন আগেই বাবার সাথে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পলিসি বোঝাচ্ছিল।
তাও হাসি হাসি মুখ করেই বললুম 'ভালো আছে।'
- 'তোমার নামটা যেন কি বেশ?'
বললুম নামটা।
- 'কোন কলেজে পড়ো যেন বেশ?'
- 'স্যার গ্র‍্যাজুয়েশন কম্পিলিট।'
'চাগড়ি টাগড়ি কিছু পেলে?'
উররররিশালা এত বিনীত উত্তরের পরেই বাউন্সার!
- 'না কাকু, ওটা নিয়ে এখন ভাবছি না।'
-'সে কী!' ভদ্দরলোক বোধহয় বজ্রাহত হলেন, 'চাগড়ির চেষ্টা করছ না! এখনকার দিনে চাগড়ির অভাব? ছেলের হাতের মোয়া। কম্পিটিটিভ এগজাম দাও, এম.বি.এ করে নাও, রাইসে ভত্তি হয়ে যাও, কম্মক্ষেত্ত কিনে নাও - আমার মেয়ে তো চার মাস হল রাইসে ভত্তি হয়ে গেচে, চাগড়ি এই পায় পায় কচ্চে। সরকারি, পাইভেট, কপ্পোরেট - হু হু করে সব চাগড়ি পেয়ে যাচ্চে, চেষ্টা কল্লেই পাবে।'
দোকানদারটাও দেখি ওজন টোজন ফেলে ছানার জিলিপির মত উৎসুক মুখ করে এগিয়ে এসছে শুনবে বলে। খজরা খদ্দেরগুলোও কান খাড়া করে সরে এসছে।
নাক টাক চুলকে বললুম - 'আসলে কাকু পাচ্ছি না বললে ভুল হবে। করছি না। বাড়ি এসে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। হাতে পায়ে পরে যাচ্ছে। কিন্তু ভাল্লাগছে না তাই যাচ্ছি না।'
- 'কা- কারা ডাকতে আসছে? বুঝলাম না ঠিক।'
- 'কেন কাকু? যারা চাকরি দেবে তারা - রেল, ব্যাঙ্ক, পোস্টাপিস, চিড়িয়াখানা সব্বাই। প্রাইভেটও আসছে - গুগুল, ফেসবুক, সিমেন্স, রিলায়েন্স। বললে বিশ্বাস করবেন না বাড়ির সামনে ধর্ণা দিয়ে পরে আছে। কিন্তু কাকু মুড নেই - যাচ্ছি না।'
- 'ক্-কী? এখনকার দিনে চাগড়ি কি মুখের কতা নাকি? ছেলেপুলে হন্যে হয়ে ঘুরছে, আর তোমার বাড়ি এসে লোকজন বসে আছে? সব কি অত সহজ নাকি খোকা?'
ন্যাকা হাসি হেসে অত্যন্ত বিনীত ভাবে বললাম - 'কিন্তু এই যে কাকু আপনি এইমাত্র বললেন মনে হল। কি যেন? হ্যাঁ মনে পরেছে - চাগড়ি টাগড়ি এখন তো ছেলের হাতের মোয়া!'
- 'না মানে আসলে - মানে এতটাও সহজ না - আসলে মানে ওই হিসেবে আমি বলিনি - ব্যাপারটা হলো কি আসলে -'
কাকুর ডিফেন্স নড়বড়ে দেখে এবার ইয়র্কারটা ছাড়লুম।
- 'আপনার মেয়ে মানে এঞ্জেল প্রিয়া তো? যা খাটছে খুব শিগগির চাকরি পেয়ে যাবে দেখে নিন। রাইস না কোথায় যাওয়ার জন্য আপনি তো দেখছি লোকও রেখেছেন একটা। ওই পগেয়া বাইক নিয়ে একটা ছেলে রোজ দেখি দিতে আর নিতে যায়। আপনার মেয়েরও খুব চেষ্টা কাকু - কোনোদিন ক্লাস কামাই করে না। কাল এই বৃষ্টিতেও দেখি ড্রাইভারটাকে জড়িয়ে ধরে বাইকে করে যাচ্ছে।'
এই অবধি শুনেই কাকু দেখি তড়বড় করে 'দেখি ভাইটি তাড়া আছে' বলে ব্যাগ ট্যাগ খুঁজতে লাগলেন।
- 'শুনুন না কাকু। ভাববেন না আপনার মেয়ে বলে প্রশংসা করছি। কী ডেডিকেশন! কী টেনাসিটি! সেদিন নন্দনে দেখি এই বৃষ্টিতেও একটা ছাতার তলায় একটি ছেলের সাথে বসে পড়া বুঝছে। তাপ্পর দেখি - '
কাকুর খুব তাড়া ছিলো বুঝি। দেখি ব্যাগ ট্যাগ ফেলেই হুড়মুড় করে রাস্তায় নেমে পরলেন। কাদা টাদার ওপর দিয়ে ছুটতে গিয়ে সড়াৎ করে রবের্তো কার্লোসের মত স্লাইডটা মাইরি বলছি আনএক্সপেক্টেড ছিল।
তুলতাম। বিশ্বাস করুন তুলতাম। কিন্তু দু'হাতে দুটো ভারী ব্যাগ ছিলো যে। আসলে মানে -
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে (প্রায়)।)

Follow Nirban Ray in Facebook.

No comments:

Post a Comment