Monday, 20 June 2016

খিদে






।।খিদে।।
                       নির্বান রায়
পায়ের পাতা ভেজানো ছোট্ট ছোট্ট ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ছপ ছপ করে হাঁটছিলো মেয়েটা। ছোট্ট পায়ের হালকা চাপে থকথকে বালিতে ছাপ তৈরি হওয়ার সাথে সাথে এসে মুছে দিচ্ছিল সমুদ্র। সোঁদা সোঁদা হালকা আঁশটে নোনতা গন্ধের বালির ওপর দিয়ে শ্যাওলা সবুজ সমুদ্রকে পিছনে ফেলে তীরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল মেয়েটা - বয়স খুব জোর আট কি নয়। সাদা ফ্রকে জল আর বালির ছাপ। পিছনের ফিতেটা ছিঁড়ে মাটিতে লুটোচ্ছে। পায়ের হাঁটু আর হাতের কনুই অবধি ভিজে বালি মাখা। কোঁকড়ানো এক মাথা চুল আর বড় বড় দুটো চোখে ভয় আর বিস্ময়। দীঘার এদিকটাতে ট্যুরিস্ট আসে না। বলতে গেলে একদম শেষপ্রান্ত। জেলে বস্তি ছাড়িয়ে ঝাউয়ের বন লম্বা হাইওয়ের কাছে ঘন হয়েছে। ভিজে বালি থেকে এবার পা পরল শুকনো কিচকিচে হলুদ বালির ওপর। ভিজে পায়ে শুকনো বালি আঠার মত আটকে গেল। বাঁ দিকে তাকিয়ে মেয়েটা দেখল ঝাউবনের পিছনে সূর্য ডুবে গেছে। আকাশ ক্রমশ ওপরের দিকে লাল থেকে ঘন বেগুনি। ডান দিকে তাকিয়ে দেখল অনেক অনেক দূরে যেখানে সমুদ্রটা বাঁক নিয়েছে সেখানে বিচের ধারে দোকানগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে - এত দূর থেকে অন্ধকারে কটা জোনাকীর মত লাগছে। মেয়েটা কাঁকড় রাস্তার ওপর দিয়ে টলতে টলতে বাঁ দিকের জংগলের দিকে হাঁটা দিল।
ঝাউবনের ধারে একটা ভাঙা নৌকোর ওপর বসে অনেক্ষণ ধরে মেয়েটাকে লক্ষ্য করছিলো লোকটা। ফর্সা গোলগাল চেহারা তার মানে বড়লোকের মেয়ে। এক পেট চোলাই গিলে ভাঙা নৌকোটায় শুয়ে গাছের ছায়ায় জবরদস্ত ঘুম দিয়েছিলো দুপুরে। উঠে বসেই দেখে একটা বাচ্ছা মেয়ে একটু দূরে সমুদ্র থেকে উঠে আসছে। গাছের আড়াল থেকে ভালো করে দেখে লোকটা বুঝল ধারে কাছে কেউ নেই - মেয়েটা একা। কোনরকমে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। শালা এক মাস হয়ে গেছে কোন মেয়েছেলে পায়নি। শেষ পেয়েছিলো হানিমুনে আসা একটা নতুন বউ। জায়গাটার খুব বদনাম। এখানকার লোকজন বিকেল থেকেই আর পারতপক্ষে এই জংগলের ধার মাড়ায় না - জংগলে নাকি অপদেবতা আছে। তার মত লোকদের ওসব ভয় করলে চলে না - লোক যেখানে আসে না সেখানেই তার কাজের সুবিধা। এদিকটাতে বড় দল ছাড়া ট্যুরিস্টরাও আসে না বড় একটা। ওদিকে জেলেবস্তিতে ঢুকলেও জেলেরা কুপিয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেবে বলেছে। রেপুটেশনটাই এমন বানিয়েছে - মনে মনে হাসল সে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে - দিগন্তে যেখানে সমুদ্র আকাশে মিশেছে সেখানে কয়েকটা আলোর বিন্দু ভাসছে। যাই হোক আজ ভগবান মুখ তুলে তাকিয়েছে। লুঙ্গির ভেতর থেকে হাত বার করে ঝাউবনের দিকে পা বাড়ালো লোকটা।
ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে টলতে টলতে এগিয়ে চলল মেয়েটা। গাছের ওপর থেকে ঘর ফেরা পাখিদের কিচিমিচি শোনা যাচ্ছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। জায়গাটা কাঁটা ঝোপে ভর্তি। হাত পায়ের দু'এক জায়গায় কেটে গেল - তাতেও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। পেছন দিক থেকে খড়মড় করে কারো আসার শব্দ পেয়ে চমকে ঘুরে দাঁড়ালো সে। কাউকে দেখতে পেল না। সন্ধে নেমে এসছে। ঝাউবনের ভেতরটায় প্রথম সন্ধের হালকা নীল মায়াবী আলো। কাঁপা কাঁপা কচি গলায় ডাক ছাড়ল মেয়েটা, "ভাই? ওই ভাই? তুই কোথায়?"
পেছনের ঝোপের মধ্যে থেকে একটা লোক বেরিয়ে এসে মেয়েটার কাঁধে হাত রাখল। ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল মেয়েটা। লোকটা কালো ছোপ ধরা দাঁত বার করে হেসে বলল, "ভয় নেই মামণি, আমি খুব ভালো লোক। তোমার বাবা মা কোথায়?" দুদিকে মাথা নেড়ে মেয়েটা বলল, "জানি না।"
-"সন্ধেবেলা একা একা জঙ্গলে কি করছ তুমি?"
-"আমি আমার ভাই কে খুঁজছি। কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। ভাইয়ের খুব খিদে পেয়েছিলো। খুব ছোট তো, খালি খিদে পায়।"
অন্ধকারে লোকটার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল যেন।
নীচু হয়ে মেয়েটার মুখের কাছে মুখ এনে সাপের মত ফিসফিসিয়ে বলে উঠল লোকটা,
-"আমার সাথে যাবে? অনেক খাবার দেবো। অনেক চকলেট দেবো। খুব আদর করব"
-"ভাই কে না নিয়ে যাব না। ওকে আগে খুঁজি। দু'জনে একসাথে খাব। খুব মজা হবে।"
এক মূহুর্ত কি যেন চিন্তা করে লোকটা বলল, "আচ্ছা চল।"
বনের ভিতর দিকে লোকটার হাত ধরে এগিয়ে যেতে লাগল মেয়েটা। মাঝে মাঝে 'ভাই ভাই' বলে ডাকতে লাগল। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে অদ্ভুত আলোছায়ার খেলা শুরু করেছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর আর সহ্য করতে পারল না লোকটা। বিরক্ত হয়ে বলল, "তোর ভাই আর নেই। তুই আমার সাথে চল।" মুখটা মেয়েটার কানের কাছে নামিয়ে এনে লোকটা আবার ফিসফিসিয়ে বলল, "এই বনে সন্ধেবেলা বাচ্ছাদের আসতে নেই। এলে আর কেউ ফেরে না। তাড়াতাড়ি পালিয়ে চল। নইলে তোকেও আর ভাইয়ের মত কেউ খুঁজে পাবে না।"
মেয়েটা বলল, "তুমি কি করে জানলে?"
মাথায় রক্ত উঠে গেল লোকটার। চুলের মুঠি চেপে ধরল এবার। মেয়েটা ককিয়ে উঠল।
দাঁতে দাঁত চেপে হিসিয়ে উঠল লোকটা, "আমি সব জানি ------- আআআআহহহহহহহহ......"
রক্ত হিম করা একটা চিৎকার ছেড়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পরল সে।
কিসে যেন একটা সাংঘাতিক কামড় বসিয়েছে লোকটার পায়ের পেছনের গোড়ালির ওপরের  শিরাটায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। হাঁপাতে হাঁপাতে আর গোঙাতে গোঙাতে লোকটা পা চেপে বসে পরল মাটিতে। মেয়েটা হাততালি দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল, "ভাই কি মজা। তোর জন্য দেখ কত খাবার এনেছি।"
গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো তেরছা হয়ে এসে পরল। লোকটা চোখ বড় বড় করে দেখল হাত পাঁচেক দূরে বন্য জন্তুর মত লাফানোর আগের মূহুর্তের ভঙ্গীতে চার হাতে পায়ে হামা দিয়ে বসে আছে একটা চার পাঁচ বছরের ল্যাংটো বাচ্ছা। চোখ গুলো আর যাই হোক মানুষ এর না - আর হাঁ করা ক্ষুধার্ত মুখের দুদিকে দুটো শ্বদন্ত। অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠল লোকটা। ঘাড়ের কাছে গরম নিশ্বাস পরতে চমকে তাকালো মেয়েটার দিকে। চাঁদের আলোয় দেখা গেল দুটো ধারালো শ্বদন্তের ঝলক - হিংস্র একটা অপার্থিব চাপা গর্জন ছেড়ে ছেড়ে চকিতে দাঁত দুটো বসিয়ে দিল লোকটার গলার শিরা লক্ষ্য করে। ছটফটানি থামতে বেশীক্ষণ লাগল না। হলদে দুটো জান্তব চোখ লোকটার নিস্পলক চোখে স্থির রেখে খসখসে গলায় মেয়েটা ফিসফিসিয়ে উঠল,"তুমি ঠিকই বলেছিলে। রাত্রে এই জংগলে এলে কেউ ফেরে না।"

No comments:

Post a Comment